অনেক হেটেছ উদ্দেশ্যবিহীন, তাগড়া সকাল বা দুপুরের প্রখর রোদে বা সন্ধ্যার আগে ঘুরে ফিরে আসা যায় এমন ব্যাপ্ত বিকেলবেলায়– মহাসড়কের দিকে ছুটে চলা ক্রমশ ব্যস্ত ঝুকিপূর্ণ রাস্তার চিকন ফুটপাথ ধরে; পরিচিত মসজিদ-মাদ্রাসা- নিউহোস্টেল- হাসপাতাল ছাড়িয়ে জটলাগা বেবিস্টেন্ড পার হয়ে অপরিচিত গ্যারেজ, লোহালক্করের দোকান, সরকারি অফিসের অচেনা কার্যালয়, একটানা নিরস রড-সিমেন্ট- পাইপ- সিরামিকের দোকানপাট অতিক্রম করে যেতে কী যেন আবিষ্কারের লোভে! হয়তো নিস্তব্ধ ছায়াচ্ছন্ন এক কবরস্থান, কোনো নির্মাণাধীন ভবনের ধূধূ অবসর, লুকানো পুকুরের নির্জন ঘাটলা– এসব উদাসী অবকাঠামো ছাড়াও, রাস্তার ধূলো ও যানবাহনের গতিশীল ঝাপটা সহ্য করে টিকে থাকা ভীষণ অপরিচিত কোনো গন্ধহীন বনফুল… যেন এরা তোমার জন্য অপেক্ষা করছে এই ভ্রান্তিতে হেটে চলতে লুঙ্গি পরেই; বিছানা থেকে পোদ্দার বাজার বিশ্বরোড পর্যন্ত দীর্ঘ পথ, পা দিয়ে মেপে অধিকারভুক্ত করে নিতে চাইতে একা একা– লক্ষ্যহীন নিঃসঙ্গ বাসি মনের ক্লান্তিকর অভ্যাসে; সেখানে নতুন কোনোকিছু দেখা-জানার চেয়ে কার্যকর থাকতো এক অবরুদ্ধ অহংকার, যা কিনা ঘটনাহীন অভিযানকে অন্তর্গত দায়িত্ব হিসাবে বহন করে চলতো নিরুদ্যম স্বয়ংক্রিয় শরীরে; শহরের এই দক্ষিণাংশে তোমার কোনো কারবার ছিল না, তবুও বাসার কাপড় না পালটিয়ে অবিরাম আনমনে ছুয়ে আসতে শহরের একটা গন্ডি, যেখান থেকে শুরু হয়েছে পথের সাহসী শাখা– ঢাকা, চট্টগ্রাম, চাদপুরে চলে যাওয়া সেইসব পরকীয় পথের উদারতায় দৃষ্টির লেহন দিয়ে ফিরে আসতে বাড়ির পথে– মন সত্যই বিবাগী কিনা সেই প্রশ্নে বিবাগী ও বিরক্ত হয়ে; এই পথেরই মধ্যদেশে এক ঝাক নতুন মানুষ তোমার জীবনের কেন্দ্র দখল করতে আবির্ভূত হবে তখন তুমি জানতে না; টমছমব্রীজের পর থেকে পোদ্দারবাজার বিশ্বরোড পর্যন্ত সবটাই তোমার কাছে অনির্দিষ্ট একক, যেটা নিরুদ্দেশ ক্লিষ্ট গতিতে অতিবাহিত করে গেছ বহুবার, এখন মাঝখানের শাকতলা পর্যন্ত প্রসারিত হলো তোমার জীবনের অর্থবোধ; শুধু এজন্য নয় যে এখানে আবিরদের বাসা, বা কাউসার বুলবুলদের বাড়ি বা পার্থরাও এখানে ভাড়া থাকতো—- অদূরবর্তী রেললাইন, ঘুরপথের ইপিজেড, সড়ক জনপদ অফিসের পুকুরপার আর পুরো অঞ্চল ঘিরে থাকা বিস্তৃত জমি, জলা, রাস্তা… এইসব মিলেমিশে এক জাদরেল মধ্যাকর্ষ তোমার একটা কক্ষপথ নির্মাণ করে দিয়েছিল; যদিও আবির তোমাকে বাসায় যাওয়ার আমন্ত্রণ দিয়ে রেখেছিল কিন্তু তুমি প্রথমে বুলবুলদেরর বাসায় গেছিলে পার্থের সাথে, অপরিকল্পিতভাবে—- কলেজ থেকে চন্ডীমোড়া ঘুরতে যাওয়ার আকস্মিক সিদ্ধান্তে সম্মতি দিতে তোমার ভিতর কোনো বাধা ছিল না, যেহেতু এখন আর পরিবারের নিরবিচ্ছিন্ন প্রহরা নেই বা সকাল থেকে দুপুর অব্দি কলেজ টাইমের হিসাব বাসার কাউকে দিতেও হয়না এখন, ফলে সকালে গিয়ে বিকালের আগে ফিরে আসা যায় এমন যেকোনো দর্শনীয় স্থান বা সঙ্গ বেছে নিতে তুমি ছিলে বেজায় স্বাধীন;
সেইদিন নীলোৎপল আকাশ ক্ষরিত রৌদ্রের অবিরল মধু, ভেঙ্গে চন্ডীমোড়া পাহাড় দেখতে যাওয়ার পথে যেই ঘটনাকে শুরুতে মনে হয়েছিল বিরক্তিকর যাত্রাবিরতি, কেননা কেবল বাসা থেকে ক্যাপ আনার জন্য তোমাকে একজন অপরিচিতের বাড়িতে রেখে যাওয়া—- পার্থের অসার ফ্যাশন বিলাস মনে হয়েছিল; কিন্তু ডাকাডাকির পর পর্দা ঘুচিয়ে দর্জা খুললো যে ছেলেটি, প্রথম দর্শনেই তার রুপের তীব্র আলো তোমার হৃদয়ে এক অসহ্য আনন্দের বিলোড়ন জাগালো; “আরে পার্থ। আসো, আসো।” একপাশে সরে গিয়ে তোমাদের ঢুকার জায়গা করে দিলো; “কী মনে করে, গরীবের বাসায়!” কন্ঠে আপ্যায়ণের মিষ্টতা তোমাকে লোলুপ করলো; “আসতে পারি না! তুমি ঘর থেকে না বেরুলে, আমাদেরই ত আসতে হয় এই নূরানী থুবড়া দেখতে!”
সে লজ্জা লুকানো হাসি ফুটিয়ে বললো “বলো, বলো। কাকে নিয়ে আসছ? পরিচয় করাবা না!”
পার্থ তোমার পরিচয় দিলে সে হাত বাড়িয়ে বললো “বুলবুল। একই কলেজে পড়া হয়?”
করমর্দন করার সময় তার উষ্ণ কোমল মাংসের স্বাদ পেলে—- যেন হাড়ের অনমনীয়তা আর ত্বকের পুরুষালী কর্কশতা, সে তার মাধুর্যের মৃদু উত্তাপে গলিয়ে তোমাদের জন্য দুর্লভ শান্ত সমাপ্তির যোগাড় করে রেখেছে; হাত ছাড়িয়ে নিলেও তুমি সেই স্পর্শের অব্যবহিত স্মৃতিকে রক্ষা করতে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে রাখলে, “হ্যা। আমি আর্টসে যদিও।”
“বেশ।” সে বললো; তার এই সামান্য কথা, সোফায় শান্ত হয়ে বসে থাকা—- হলুদ ত্বক ছুয়ে থাকা নরম সাদা শার্ট, অবিচ্ছেদ্য চশমা, অপ্রস্তুত ভাবকে প্রতিহত করতে স্বগোতক্তিময় হাসি… এইসব কিছু তোমাকে একত্রে আকর্ষণ করলো, যেন এইখানে তার সান্নিধ্যে নিজেকে রোপন না করা পর্যন্ত প্রশান্তি পাবে না; পার্থ বললো ‘’সে বসুক এখানে, আমি বাসা থেকে ক্যাপ নিয়ে আসি।”
“কোথাও যাচ্ছ নাকি তোমরা?”
“হ্যা। চন্ডিমোড়া পাহাড়ে। তুমি যাবে?”
সে এক মুহুর্ত কপাল কুচকে বললো “যাওয়া যায়।”
“ফাইন। তো। তোরা থাক। আমি আসতেছি।” বলে সে ক্যাপ আনতে চলে গেল;
তোমরা দুজনে কয়েকটা নিরব মুহুর্ত পার করলে, সে তোমাকে রেখে উঠতে উঠতে বললো “তুমি বসো। আসতেছি।”
তুমি ভেবেছিলে হয়তো এই বৈঠকখানায় একা বসে থাকতে হবে পার্থ না আসা পর্যন্ত, কিন্তু অনতি বিলম্বে ট্রেতে করে নাস্তা নিয়ে ফিরলো সে– তিনটি প্লেটে দামী কেক, আঙুর আর ছানামুখী, তোমার সামনে রেখে বললো “খাও।”
তুমি কেক ভেঙ্গে খাচ্ছিলে, ওর সাহচর্যের শুকুন দংশিত আলমে, অগ্নিবর্ন কপালের উপর চুলের ভদ্র ঢেউ আর কমলার কোয়ার মতো ঠোটে, হাসির পরিচলন দিয়ে তোমার মনের শৃঙ্গার করতে করতে; টুকিটাকি কথা হচ্ছিল—- সবচে বেশি ভালো লাগছিল তার শরীরে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, যেন সারাদিন বসে বসে সকল গুরুত্বহীন বিষয় নিয়ে সে তোমার সাথে আলাপ করে যেতে পারবে; কিন্তু দৈবের মতো ধুপধাপ শব্দ করে পার্থ হাজির হয়েই বললো “চলো যাই। রেডি হও নাই তুমি?”
“বেচারা কিছু খাক। তুমিও খাও।’’.
“সময় নাই। দুপুরের মধ্যে ফিরতে হবে।”
পার্থের এই অস্থিরতা একদম পছন্দ হলো না তোমার, তবু বুলবুল রেডি হতে চলে গেল এবং খুব অল্প সময়ে ফিরে এসে আবারো বললো, “তুমি ত কিছুই খেলে না!”
“হের খাওয়া লাগবে না। বের হই চলো।”
কিন্তু বুলবুলের পাশে বসে আস্তে আস্তে খেয়ে যেতে তোমার রোমকূপ এতো অলস সুখে ভরাট হতেছিল! উঠতে ইচ্ছা করছিল না, তবু পরিস্থিতির চাপে উঠতে হলো—- তিনজনে মিলে বেড়িয়ে গেলে রাস্তায়, হাত দিয়ে বাস থামাতে;
সারাদিন পাহাড়ে পাহাড়ে, শাল পাতা ঘষে ঘষে নাম রোদে, ওর পাশে পাশে চলতে তোমার প্রবল আনন্দ হচ্ছিল; সে সাথে থাকায়, এই টিলা, গাছ, ছোট ছোট অনামী ঝোপ, সেখানে ফুটে থাকা দুধ বেগুনি রঙের পাহাড়ি ফুল, ভীষণ ভালো লাগছিল তোমার; একটা ফুল ছিড়ে তার হাতে দিলে, সে নিলো, বললো “থ্যাংস।” তাকে জিজ্ঞাসিলে এই ফুলগুলোর নাম জানে কিনা, সে হেসে না বললো; দেখলে পাহাড়ে চড়ার শারীরিক শ্রমে সে তোমার থেকে অপটু– তার এই মধুর অক্ষমতা তোমাকে উৎসাহ দিলো, চেপে রাখা কথার আবেগ উন্মুক্ত করে দিতে; সে তোমার সব অকঞ্চিতকর কথা ও জিজ্ঞাসা শান্তভাবে শুনছিল তর্কহীন মনোযোগে… সে পাশে আছে স্মিত হাসির ধ্রুবক ঘটিয়ে, কেবল এজন্যই তুমি নিশ্চিন্ত বীচিভঙ্গে প্রবাহিত হতে পারছিলে—- নিজেকে নিয়ে নাছোড় সচেতনতাকে ছুটি দিয়ে;
পাহাড়ের দেবী দর্শন করে ফেরার সময়, বাসে তার পাশেই বসতে পেলে; বিকেলগামী রোদের মৃদু পীড়নে ওর শরীর থেকে মাংস পোড়া গন্ধ বেরুচ্ছিল, সেই গন্ধের আঘাতে আঘাতে বিভোরতা ভেঙে গেলে তুমি, গুঞ্জনময় মৌমাছির মতো তাকে প্রদক্ষিণ করতে লাগলে—- তার সুপক্ব কপোল, শ্বাসের শব্দ, তার নিরব আধশোয়া ভঙ্গির নিকটে বসে তুমি স্পন্দিত হলে আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী সর্বোচ্চ তরঙ্গ দৈর্ঘ্যে; যেন খুব তাড়াতাড়ি শাকতলা চলে আসলো বাস, নামার আগে বাচ্চাদের মতো তোমাকে টাটা দিলো বুলবুল; তুমি হাসলে, সেই হাসির আড়ালে চোখ খুললো ধ্যানভ্রষ্ট দুর্বাসার নবজাত যন্ত্রণা।
তারপর থেকে কলেজের ক্লাসে মনোযোগী, স্যারদের প্রিয় নিবিড় নির্বিঘ্ন অধ্যাবসায়ী ছাত্র থেকে যাওয়া, এইসব আগের মতো অবিকল রইলো না; সেইদিনের অপূর্ব অনুভব বারবার পেতে ইচ্ছা করছিল; কলেজে পার্থ আর আবিরকে দেখলে তোমার কিছুটা ভালো বোধ হতো কারণ ওদের সাথে জড়িয়ে আছে বুলবুলের স্মৃতি; আবিরকে বুলবুলের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে সে তেমন আগ্রহ না দেখালেও, ওর সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য ঠিকই দিলো বৈজ্ঞানিক নিষ্ঠায়– বুলবুল ইবনে তাইমিয়া স্কুল এন্ড কলেজে পড়ে, ওর বাবা সরকারি চাকুরিজীবী, শাকতলার স্থায়ী বাসিন্দা ওরা, খুবই ডিসেন্ট ফ্যামিলি, আর বুলবুলও অমায়িক ছেলে কিন্তু বৌদ্ধিক মানদন্ডে তেমন উঁচু না—- বুলবুল সম্পর্কে ইতিবাচক বা নেতিবাচক যেকোনো তথ্যই তোমাকে আরাম দিতো;
হঠাৎ এক বিকেলে, আশাবাদী ছটফটানির তাড়নায় শাকতলার উদ্দেশ্যে হাটা দিলে অনিশ্চিত লোভে– বুলবুলদের বাসার সামনে পৌছে কিছুক্ষণ ইতস্তত করলে ভেতরে ঢুকবে কিনা! গিয়ে কী বলবে? মাত্র একদিনের পরিচয়ে কোনো কাজের অজুহাত ছাড়া বিনা আমন্ত্রণে বাসায় যাওয়াটা শোভন কিনা নিশ্চিত না হয়েই তুমি তাদের দরজার কড়া নাড়লে– বেশ কিছুক্ষণ পর, সে দরজা খুললো, চোখে-মুখে ঘুম লেগে ছিল তখনো; “আরে, তুমি! আসো, ভেতরে আসো।”
তার ঘুম ভাঙ্গালে বলে তুমি লজ্জিত হয়েও ভিতরে গিয়ে সোফায় বসলে, সেও চোখ কচলাতে কচলাতে বসলো বড়ো সোফাটায়, একটা হাই তুলে ঘুম তাড়ানোর কৃত্যের ভিতর থেকে শব্দটা বললো “তারপর?”
সেখানে বিরক্তি ছিল না, কৌতূহল ছিল, তবে প্রথম দিনের মতো আপ্যায়ন না পেয়ে তুমি ঘাবড়ে গেলে; উপস্থিত বুদ্ধি শূন্যের কোঠায় ছিল বলে একটা জুতসই অজুহাত দেখাতে পারলে না, যেটা বললে সেটা সত্যের কম্পন “হাটতে হাটতে চলে আসলাম তোমাদের এলাকায়। ভাবলাম দেখা করে যাই।”
“বেশ। আবিরদের বাসায় গেছ?” তখনো তার ঘুমের লাইক কাটেনি পুরোপুরি;
“না।”
“যাবে? এখন।”
“না না।” তুমি উঠে দাড়ালে, “আজকে না। তোমার ঘুম ভাঙলাম!” বললে অপরাধীর মতো;
“তাতে কী হইছে?”
“তুমি রেস্ট নাও। আমি যাই তাইলে।”
“মাত্র আসলে! বসো না।”
তুমি বসতেই চাচ্ছিলে; কিন্তু সেদিনের মতো জাদু মুহুর্তটা পাচ্ছিলে না আজকে—- কী নিয়ে আলাপ করবে, দুজনের এমন কোনো কমন ইন্টারেস্ট আছে কিনা সেটাও জানো না তখন, এছাড়াও এমন ক্লান্ত বিকেলে এরবেশি ঝুঁকি নিতে সাহসও হলো না, বললে “আজকে যাই।” বলেই বেরিয়ে আসতে চাইলে, দর্জায় সঠিকভাবে না ঘুচানো তন্দ্রালু পর্দাটায় তুমি প্যাচিয়ে গেলে, নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়ার সময়টায় অস্বস্তি হতে লাগলো, তোমার পিঠে ওর বিস্মিত দৃষ্টি কল্পনা করে—- সিড়িতে জুতা পরতে পরতে তাকে বললে “আসি।”
সে সোফা থেকে না উঠে পারলো না, ঘরের মাঝখান বরাবর এগিয়ে বললো “আবার এসো।”
তুমি তার বাসা থেকে যতো দ্রুত সম্ভব দূরে চলে যেতে এগিয়ে গেলে রাস্তার দিকে।
এক ছুটির দিন, কলেজ নেই, সকাল বেলাটা কী করার বাকি আছে ভাবতে ভাবতে কেটে গেলে, দুপুরের খাওয়ার পর মন বেলাগাম হয়ে গেল; তোমাকে জানতেই হবে সেদিন ওর বাসায় যাওয়াতে সে বিরক্ত হয়েছে কিনা! তোমার সাথে সদ্য বিগত সাক্ষাৎ একটা সৌজন্যের পোশাক পরানো বিরক্তিতে যতি পাবে এটা তোমাকে ব্যথা দিচ্ছিল—- আতকা পড়ি-মরি করে রেডি হতে গিয়ে প্যান্টের মধ্যে পা ফেসে গেলে, মেজ আন্টি সন্দিগ্ধ মনে জিজ্ঞেস করলেন “এই দুফুইরা বেলা কই যাস?”
“সামনেই।”
“সামনে কোনানে? পা অনেক লম্বা হইছে তোমার। এই তেদুফুইরা বেলা কিয়েরে তুই বাইর হইবি? খুব বাইরম বাইরম স্বভাব হইছে দেখতাছি।”
উনার বকবকানি বিশেষ পাত্তা না দিয়ে তুমি বেড়িয়ে পড়লে, বুলবুলদের বাসার উদ্দেশ্যে– টমছম ব্রিজ পার হওয়ার পর থেকে তোমার শরীর কেমন অবশ হতে লাগলো; যতোই ওদের বাসার সামনের কালভার্টটা স্পষ্ট হচ্ছিল, তোমার বুকের ধুপধুপানি বাড়তে লাগলো; বাসার সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে ওদের আংশিক উঠানে, ছায়া দেয়া বকফুল গাছটাকে দেখলে– এখান থেকে উঁচু সিড়ি লাগানো ঘরটির দরজা দেখা যায় না; ভিতরে ঢুকবে কি এই দুপুরবেলা! এটা কারো বাসায় যাওয়ার সময়! আজকেও তার ঘুম ভাঙিয়ে জিজ্ঞেস করবে—- আমি আসাতে তুমি বিরক্ত? কী ষ্টুপিড তুমি! তবু এতোদূর আসার পর ফিরত যাওয়া যায় না; মনকে আর কিছু ভাবার অবসর না দিয়ে তুমি উঠানে নেমে পড়লে, দরজায় বেশ খানিকটা সময় কড়া নাড়ার পর একজন মহিলা পেছনের দরজা দিয়ে বের হয়ে বিল্ডিং ঘেষে দাড়ালেন; দেখলে বুলবুলের মতোই হলুদ গায়ের রঙ, মোটা রসালো ঠোঁট– রুপ ও সম্ভ্রান্তি দুটোই আছে, তবু কিসের অভাবে সংকোচিত যেন! চোখে কোনো কথা নাই– জিজ্ঞাসাও না; বললেন “বুলবুল ত বাসায় নেই। গ্রামের বাড়ি গেছে ওর বাবার সাথে।”
“অহ। আসি তাহলে?” অনুমান করলে উনি বুলবুলের মা, কিন্তু কি বলে ডাকবে– আন্টি, খালা, মাসি.. বুঝতে পারলে না; উনি জিজ্ঞেস করলেন “ও আসলে কিছু বলতে হবে?”
“না।’’ একবার ভাবলে তোমার নাম বলে, বার্তা রেখে যেতে যে তুমি এসেছিলে, চিন্তাটা খারিজ করে তুমি ওদের বাসা থেকে বেড়িয়ে আসলে; কার্লভার্ট অতিক্রম করার আগেই পার্থের সাথে দেখা হয়ে গেল—- সে যাচ্ছিল, ধর্মসাগড় পার পার্কে; তোমাকে দেখতে পেয়ে চোখ বড় হয়ে গেল তার “তুই এখানে? বুলবুলের কাছে আসছিলি?”
“হ্যা। মানে ভাবলাম সবার সাথে দেখা করবো।’’
“অহ। এখন ত আমি বাসা থেকে বের হয়ে গেছি। চল পার্কে যাই।” কোনো অদ্ভুত কারণে সে তোমাকে নিজের বাসায় নেয় না– কোনোদিন বলে, “মা বাসায় নেই।” আবার “ঘর এলোমেলো হয়ে আছে।”… এইধরনের অজুহাত থাকতো তার;
নির্দিষ্ট কোনো কারণ ছাড়াই, সকলের এই পার্কে যাওয়ার বাতিক তোমাকে বিরক্ত করতো; বলল, “না। তুই যা। আমি আবিরের সাথে দেখা করি বরং।”
“সে কি আছে বাসায়?”
“জানি না। ওর বাসা কোনটা?”
“হায়! বাসাও চিনোস না!” বলে হাত দিয়ে দেখিয়ে দিলো, রাস্তার ওইপাশে তিনতালা বিল্ডিংটাকে “ওরা দুই তালায় থাকে।”
“চল। ও আছে কিনা দেখে আসি।”
“না ভাই। তুই যা।”
“কেন?”
“এতো মুডি লোকজন আমার ভাল্লাগেনা। তুই যা। তবে এখন তাকে পাবি কিনা, জানি না।” বলে থামলো;
এরপর “আমি যাই রে।” বলতে বলতে সে একটা চলন্ত সিএনজি দাড় করালো, সেটায় বসতে বসতে হাত নেড়ে তোমাকে বললো “দেখা হবে।”
সিনজি চলে গেলে তুমি ওর দেখানো বিল্ডিংয়ের সংকীর্ণ সিড়ি বেয়ে দুইতালার লোহার গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে কলিং বেল টিপলে– আবির বাড়িতে না থাকলেই ভালো, তুমি ভাবছিলে; শূন্য মনে বাসায় ফিরে যাবে একটা রুক্ষ্ম দুপুরের নিস্ফলতা বুকে নিয়ে; তোমার স্বীকার করে নেওয়া বিমর্ষতা চিড়ে আবির নিজেই গেইট খুললো– দুজনেই দুজনকে দেখে বিস্মিত ও আনন্দিত হলে; ধরেই নিয়েছিলে সেও পার্কে চলে গেছে—- আবির প্রায় চিতকার করে বললো “আরে ব্বাবা! কে আসলো আমাদের বাসায়! ডুমুর গাছে ফুল ফুটলো নাকি! ভেতরে আসো।”
ওর প্রাণখোলা অভ্যর্থনায় তুমি মজা পেলে “কেন? আসবো বলছি না! চলে আসলাম।”
“হাহা। তুমি আমার বাসার সামনে এসে চলে যাও, ভাবছ খবর পাই না?”
“সেদিন তুমি কলেজে…”
“তারপরেও আসছ না। বুলবুলদের বাসায়!’’
“হ্যা.. আমি… আসতাম হলে…”
“ফরগেট ইট। ফাইনালি আসছ। বাসা চিনছ কিভাবে?”
“পার্থ দেখিয়ে দিলো।”
“ও আসলো না।”
“না। সে পার্কে চলে গেল। আমি ত ভাবছিলাম, তোমাকেও পাবো না।’’
“ভালো হইছে। নাটকবাজটা আইছে না।”
দুজনেই হাসলে; “আজকে পার্কে যাইতে ইচ্ছা করছিল না। তুমি আসাতে ভালো হলো। তোমারে নিয়ে রেললাইনে ঘুরতে যাবো।’’
তারপর, অন্দর মহল থেকে ট্রেতে করে নাস্তা আসলো; কমলার কোয়া, বিস্কুট আর সরবত—- প্রথমবার কেউ আসলে, কিছু খেতে দিতে হয়, এটাই নাকি প্রথা; অথচ আবির যেদিন প্রথম গেছিল, তুমি এই সামাজিকতা নিয়ে ভাবোনি, নেহাৎ মামি তৎপর হয়ে নাস্তা রেডি করে দিয়েছিল বলে, নাহলে আবির তোমাকে বর্বরই ভাবতো? যেমন পার্থকে নিয়ে ভাবছে এখন “তোমারে ফালাইয়া সে একা পার্কে চলে গেল! বাসায় যেতে সাধলো না!”
“সে পার্কে যেতে বলছিল। আমার ইচ্ছা করে নাই।”
“তবুও। অবশ্য বাসায় গেলেই কি! কেউ বাসায় গেলে কীভাবে আপ্যায়ন করতে হয় এই কালচার ওর মধ্যে আছে নাকি!”
একজন অপরজনকে মুডি ভাবে আর অপরজন আনকালচারড– দুটি উষ্মারত মনোভাব তোমাকে শয়তানি আরাম দিলো “একটু অপেক্ষা করো। আমি রেডি হয়ে আসি।” বলে সে তোমাকে তার আড়াই হাত প্রশস্ত নিজের পড়া ও শোয়ার ঘরে বসিয়ে ভিতরে রেডি হতে চলে গেল; সেদিন, বাইরে বের হয়ে ওদের পাড়ায় সরকারি কলেজের আরেকজন কমার্সের ছাত্র কাউছারকেও ডেকে বের করে আনলো—- তোমাদের পূর্বপরিচয় ছিল, কুশল বিনিময় শেষে সে আবিরকে জিজ্ঞেস করলো “বুলবুল যাইতো না?”
“ইস! এখন আবার উলটা যাইতাম! বাদ দে। আমরা আমরা ঘুইরা আসি। বুলবুলরে নিয়া আরেকদিন যামু।”
তুমি আর প্রকাশ করলে না যে বুলবুল বাসায় নাই, হয়তো বুলবুলও জানবে না তুমি আজকে এসেছিলে, ওর কাছে, সেটাই ভালো—- এই ছোট্ট দলের অংশ হয়ে সাতমারা রেইল গেইট মোড় থেকে রেল লাইন দিয়ে হেটে চলা, কখনো লোহার পাত থেকে পা ফসকে গেলে পাথরের রাজ্যে টক্কর খাওয়া টকটক শব্দ, খেজুর গাছের সারিতে শেষ বিকালের মুরুব্বি রোদ, পাশের জমি-জলা মেশানো মাঝারি প্রান্তরের শেষে গ্রামের অস্পষ্ট অবয়বের উপর মুমূর্ষু সূর্যের অন্তিম রক্তপাতের প্রস্তুতি, বক শালিক আর ফিঙ্গেদের রক্তে নীড়ের প্রতি বর্ধমান বেচেইনি– এই পরিবেশে নিরুদ্বেগে হেটে চলা, প্রশ্ন নেই প্রত্যাশা নেই– এমন স্বাধীনতা যেন কতোদিন ভোগ করোনি, বা কোনোদিন– আত্মবোধ জাগার পরে!
“এতোক্ষণ লাগে আসতে?” সাইকেলের প্যাডেলে এক পা অন্য পা রাস্তায় রাখা ছিল তার—- তোমাকে তার সাইকেলের ক্যারিয়ারে চড়িয়ে প্রায় নিয়মিত পার্কে নিয়ে যেতো সে; তুমি এই ফেভার চাওনি, ওর উচ্ছৃঙ্খল বন্ধুদের দলে বিকালটা জলাঞ্জলী দিতে ভালোও লাগতো না তেমন, তবু তার আসার অপেক্ষায় থাকতে এবং সে আসার পর তার সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়াই তোমার কর্তব্য হয়ে উঠতো—- কিন্তু তার অভিযোগ অবৈধ, বরং তার বাসায় গেলে তোমাকে বসিয়ে রেখে রেডি হওয়ার নাম করে বা হুদাই অন্দরে কাটিয়ে আসতো ব্যাখ্যাহীন সময়, মাঝেমধ্যে তুমি ভেতরের ঘরের দরজায় নক করে তাকে ডাকতে, সে বলতো “আসছি। ওয়েট।” এবং এরপরেও ১৫/২০ মিনিটে তার পোশাক বদলানো হতো না; সেই আবির আজকে তোমার ২ মিনিট দেরি হলো বলে কথা শুনাচ্ছে, তোমার ভিতরে ভিতরে রাগ হলো কিন্তু চিরাচরিতভাবে তা প্রকাশ না করেই তার সাইকেলের পিছনে চড়ে পৌছে গেলে ধর্ম সাগর পাড়ে; সেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছিল, জিকো সানি মিল্টন সাগর এরকম কয়েকজন… তারা কথা বলতো, রাজনীতি নারী খেলা সিনেমা বৈদেশিক কালচার… এমন সব বিষয় নিয়ে যেগুলো নিয়ে তোমার তেমন আগ্রহ ছিল না—- কোনোদিন বুলবুল কাউসার থাকলে তোমার কিছু আপন মনে হতো আড্ডাটা; বুলবুলকে চুপে জিজ্ঞেস করতে “তোমার এখানে ভালো লাগছে?”
সে প্রশ্নটাকে গ্রহণ করতে প্রথামাফিক কপালটা খানিক কুচকে নিয়ে, মাথা নাড়তো, কিন্তু এও বলতো না যে, চলো আমরা আলাদা করে হেটে আসি; একদিন তুমিই সাধলে “চলো আমরা একটু ঘুরে আসি।” “চলো।” যেন কিছুতেই তার আপত্তি নেই! দুজনে পার্কের একটা বাক পাশাপাশি হাটলে নিশ্চুপতা বুনে—- তার মধ্যে তোমাকে নিয়ে কোনো জিজ্ঞাসা ছিল না, আর তোমার আলাপ গহীনে আটকে থাকতো তার অপর্যাপ্ত প্রতিক্রিয়ায়; ফিরে আসলে জিকো বললো “আরে বুলবুল! তুমি কোথায় চলে গেছিলে! তোমারে নিয়ে আমরা ভয়ে থাকি। কখন জানি কে কিডন্যাপ করে নিয়ে যায়!” বলে নিজেও হাসতো, অন্যদের-ও খোরাক জুটিয়ে দিতো– যেন পরস্পরকে হাস্যরসের যোগান দেয়াই আড্ডার মৌলিক দায়িত্ব; ইমন বললো “তোমার মতো দেখতে হলে এতোদিনে একহালি গার্লফ্রেন্ড জুটানো কোনো ব্যাপারই ছিল না। তুমি যে কী করো! মেয়েদের পাত্তা দেও না নাকি!”
“আইছে আমার প্লেবয়!’’ আবির বলতো, আংশিক রক্ষণাত্মক মেজাজে—- তার রেফারেন্সে যারা এখানে এসেছে তারা ট্রলের শিকার হোক সেটা সে চাইতো না; বুলবুল অবশ্য মৃদু হাসি নিয়ে এইসব উপভোগ করার ভান করতো; এরকম পারপাস ছাড়া আড্ডাবাজির মধ্যে কোনোদিন তুমি উঠে দাড়াতে, আবিরকে বলতে “আমি তাইলে যাই।” সে বলতো “আমিও ত যাবো।আরেকটু বয়!”
কিন্তু কেন? সে জানে, এখানে তোমার একদমই ভালো লাগছে না, তবু সে তোমাকে ছাড়তে রাজি থাকতো না, যেন তুমি বুলবুল বা কাউসার… থাকলে সে এই দলে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠতে পারতো; অগত্যা শূন্য মনে অপেক্ষা করতে কখন আনুষ্ঠানিকভাবে আড্ডার সমাপ্তি হবে; ফেরার পথে কোনোদিন সে বলতো “সন্ধ্যায় বাসায় ফিরতে মন চায় না, এজন্য সন্ধ্যাটা পার হওয়ার অপেক্ষা করছিলাম। তুই এতো অস্থির হইছস কেন বাসায় যাইতে? বাসায় গিয়া কী করবি?”
“তুই জানোস। আমার এরারে ভালো লাগে না।”
“আমারো ভালো লাগে না।” যদিও এটা নির্জিলা মিথ্যা—- সে ওদের সঙ্গ যথেষ্ট উপভোগ করে; পরে বলতো “কিন্তু সবার সাথে কানেকশান রাখা লাগে। কখন কারে দরকার পড়ে কে কইবো!”
তাহলে মানুষের সাথে মানুষের দরকারের সম্পর্ক! মানুষের কাছে, প্রথমে হৃদয় নয় বুদ্ধি এগিয়ে দেয়ার স্ট্র্যাটেজি তুমি আবিরের থেকে শিখছিলে—- অবশ্য এতে অল্পই সফলকাম হয়েছিলে।
বুলবুলদের বাসায় ঢুকার সাহস জুটাতে না পেরে প্রায়ই যখন তুমি আবিরদের বাসায় চলে যেতে, সে নিঃসন্দেহে খুশি হতো, কিন্তু সেটা তার নবিশী ল্যাবে আরেকটা নতুন ধরনের মনোপ্রক্রিয়াকে নেড়ে-চেড়ে দেখার শখের অভ্যাসে—- “কী বলিস! সিনেমা দেখস না একেবারে! ৩ ঘন্টার বিনদাস বিনোদন তোর ভালো লাগে না!”
“আগে দেখতাম। এখন মারদাঙ্গা সিনেমা বিরক্ত লাগে।”
“আড্ডা দিতেও তোর ভালো লাগে না। সাহিত্য ছাড়া আর কিছুতেই তোর আগ্রহ নাই?” তুমি চুপ করে থাকলে সে আরো বললো “তাইলে বেটা প্রেম কর। কবি/সাহিত্যিকরা ত অসংখ্য প্রেম করে।”
“তুই কর।” তোমার কন্ঠে রাগের ভাপ পেয়ে সে নিজের বর্তমান ক্রাশ নিয়ে তোমাকে বলতে লেগেছিল; “রুবারে তোর কেমন লাগে?’’
“কোন রুবা?’”
“তোদের ক্লাসের রুবাকে চিনস না!’’
“অহ। সেইকথা!” কিন্তু রুবার প্রতি ওর দুর্বলতা নিয়ে জানতে তোমার একটুও ইচ্ছা হচ্ছিল না, তবু সে বলবেই এবং শুনতে শুরু করলে প্রেম নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি তোমার কাছে খুব চার্মিং লাগলো, যদিও তুমি নিজে প্রেমে নিয়ে এরকম নির্ভার হতে পারতে না; সে বললো “রুবার মতো মেয়েদের কি ভালোবাসা যায়? এরা কোকের বোতলের মতো। কয়েক ঢুকে খেয়ে ফেললাম। ঝাঝ লাগলো। শেষ!” কথাটা বেশি রুঢ় শুনালে নিজেই আবার এর ব্যাখ্যা দিল, “ওর আইকিউ এতো লো! আমি চাইলেও হের লগে প্রেম করতে পারুম না। আজকে বলছি তারে, চিন্তা করতে শিখো। মনে হয় না, কিছু বুঝছে! তবু হাসে। আল্লা জানে, মেয়েগুলা সব এমনই কিনা! বুদ্ধির স্কেলে নিম্নমানের!”
প্রেম কি বুদ্ধি বিচার করে হয়! এই চিন্তাপদ্ধতি তোমার কাছে বেশ নতুন; তাকে জিগাইলে, “কলেজে এমন যোগ্য মেয়ে আছে নি, যে তোর বুদ্ধির স্কেলে পাশ করবো?”
সে খানিক ভাবলো ধ্বনিময়, তারপর বললো “আমি পাইনি এখন পর্যন্ত।” হঠাৎ তোমার কৌতূহল হলো জানতে, “আইচ্ছা! বুদ্ধির স্কেলে আমারে তুই কতো দিবি?”
“এটা ত ভাবি নাই। ভেবে নেই। দাড়া।” ভাবতে চেষ্টা করে সে ব্যর্থ হয়ে বললো “এখন ভাবতে পারছি না। তোরে পরে জানামু।”
পরে সে জানিয়েছিল—- তোমার বুদ্ধি প্রথমে তার মনে হয়েছিল নিম্নমানের, কিন্তু পরে সে ভেবে পেয়েছে তোমার বুদ্ধি গড় মানের থেকে উঁচু; কীরুপে সে এই সিদ্ধান্তে পৌছেছে সেটা জিজ্ঞেস করার সাহস হয়নি, আবার না সিদ্ধান্ত বদলে কটূ কিছু বলে ফেলে– তোমার সম্পর্কে তার বর্তমান ধারণায় খুশি থাকলে।
ওর বাসায় একা বসে থাকার মুহুর্তে টেবিলের উপর তার কলমদানী, বইপত্র, ডাইরী, খাতা, পেপার ওয়েট, একটা ছেলে বাবুর শোপিস… এইসব হাতাতে গিয়ে স্থানচ্যুত করলে সে অত্যন্ত বিরক্ত হতো; তুমি কিছু না ছুয়ে ভাবতে ওর ব্যক্তিগত জিনিসপাতি ঘাটাঘাটি করার অধিকার আসলেই ত নেই তোমার! সে মাঝেমধ্যে নিজ থেকে তার ডাইরী থেকে পড়ে শুনাতো এবং তার উপস্থিতিতে তার তৈজস ধরতে দিতো বা সেইসব জিনিসপত্র নিয়ে তোমার জিজ্ঞাসা নিরসন করতো নিরলস অনুপুঙ্খ ক্লান্তিকর ভাষায়; তবু সেদিন তোমাকে তার ঘরে একা বসিয়ে রেখে ভিতর ঘরে যাওয়ার পর যেন অন্তহীন সময় অপেক্ষা কেটে গেলেও সে ফিরছিল না, বা অন্তত একবারের জন্য এসে দেরী হওয়ার কারণ বলে যাওয়ার প্রয়োজন অনুভব করছে না দেখে তুমি মনে মনে কঠিন সিদ্ধান্ত নিলে—- এরকম হলে ওর সাথে সম্পর্ক রাখা চলে না, এবং ছোয়াছুয়ির নিষেধ অগ্রাহ্য করে তার প্যাডে লিখলে “তুই এতো ব্যস্ত আমাকে বললেই পারতি। আমার জন্য তোর পারিবারিক কাজে সমস্যা হোক আমি তা চাইনা। গেলাম। ভালো থাকিস।
ইতি……
পুনশ্চঃ কিছু মনে করিস না, অনুমতি না নিয়েই তোর প্যাডে লিখিলাম।”
এই ছোট্ট চিরকুটটা তোমাদের সম্পর্কের মানচিত্র বদলে দিয়েছিল; যদিও এর পরেরদিন কলেজে দেখা হলে তার মুখে কোনো অনউশোচনা দেখোনি—- এই প্রসঙ্গ সে উত্থাপনই করেনি, যেন তোমার এইভাবে অপেক্ষা করতে করতে চলে আসা একেবারে প্রাত্যহিক একটা ব্যাপার! সেদিন বিকালেও সে তোমার বাসায় এসে সাইকেলের বেল বাজালে তুমি অবাক হলে, এড়িয়ে যেতে চাইলেও সে শুনলো না—- মুখ ফুটে বলতে পারছিলে না যে তুমি আহত হয়েছ, বরং তুমি এটা স্বীকার করেই নিয়েছিলে, অন্যের অবহেলাই মূলত তোমার প্রাপ্য; তাই “চল না। বেশিক্ষণ থাকমু না। আজকে সন্ধ্যার আগেই ফিরে আসমু।” এসব বলে, সে তোমাকে সাইকেলের পিছনে বসিয়ে নিয়ে যেতে পারল, সাগর পাড়ে; এবং তার বিরক্তিকর বন্ধুদের সাথেও গতানুগতিক আড্ডা দিলো, তোমাকে বসিয়ে রেখে—- অনেকবার তোমার ইচ্ছা হয়েছিল, উঠে চলে আসতে কিছুই না বলে, তবু খিচ ধরে বসে রইলে পাথরের মতো; ফেরার পথে তুমি যান্ত্রিকভাবে তার সাইকেলের ক্যারিয়ারে বসলে, বড় ব্রীজের সামনে যেখানে বরাবর নামায়, সেখানে নামানোর পর আবির একটা চিরকুট মানিব্যাগ থেকে বের করে তোমার বুক পকেটে গুজে দিলো; দ্রুত সেটা বের করতে চাইলে সে তোমার হাত ধরে বারণ করলো “না বন্ধু। আমি যাওয়ার পর, পড়িস।” বলে সে বেল বাজিয়ে এগিয়ে গেল;
তুমি কারো কাছ থেকে এতোটাও আশা করোনি, যে কেউ তোমার জন্য দুটি বাক্য লিখবেঃ
“তুই হয়তো অনেক বেশি কষ্ট পেয়েছিস। আমি সেদিন তুই আছিস সেটা ভুলে গেছিলাম। এটা উচিত হয়নি। তোর রাগ হওয়া স্বাভাবিক। আমি আবেগ শো করতে পারি না। কিন্তু তুই, আসলেই আমার স্পেশাল একজন বন্ধু। ভালো থাকিস। ইতি, আবির।”
চিঠিটা, আস্ত কাগজে লেখা ছিল না, একটা টুকরা কাগজে অপুষ্ট অক্ষরে লেখা, যেন আবর্জনার স্তুপে উড়ে যেতে প্রস্তুত, কিন্তু তোমার কাছে এই স্বীকৃতি অমূল্য; মন ভিজে এলো তোমার।
এইভাবে শুরু হলো তোমাদের পত্রবিনিময়ের সিলসিলা; প্রতিদিনই ওর সাথে তোমার দেখা হতো, তবু প্রতিদিন তুমি তার উদ্দেশ্যে চিঠি লিখতে—- কখনো সেটা হাতে হাতে দিতে, কখনো ডাকবিভাগের হলুদ খামে ভরে ডাকবাক্সে পোস্ট করতে; তোমার ৩/৪ টি চিঠির বিনিময়ে ওর হয়তো একটা চিঠি পেতে, এই বৈষম্য প্রাকৃতিক, সেটা দুজনেই মানতে; জগত থেকে পাওয়া সকল আঘাত ও নিজের অধিকারহীনতা নিয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে দীর্ঘ আলঙ্কারিক রিদমে লিখতে তুমি—- দিন-রাতের বিভিন্ন মুহুর্তে যেই ভাবগুলো জমে উঠতো সেগুলোকে শব্দে সাজিয়ে নান্দনিক আরাম পেতে—- কখনো অভিমান, কখনো উষ্মা, কখনো নতুন কোনো তথ্য বা চিন্তাও লিখে ফেলতে উপর্যুপরি স্বতঃস্ফূর্ততায়; ওর চিঠিতে থাকতো—- তোমার আবেগ ও চিন্তার প্রতিফলনে ওর সাধ্যের ভিতর থেকে উঠে আসা সমাধান, সান্ত্বনা ও তার বিরল স্বীকারোক্তি, কাঠখোট্টা ব্যবহারিক ভাষায়—- বাক্যগুলো আকারে ছোট ও বক্তব্য অতি স্পষ্ট, বিমূর্ত কিছু নিয়ে লেখার ধাত ছিল না তার, বেশিরভাগটাই ছিল নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনার বিরস বর্ণনা; তবু রোলটানা কাগজে লেখা তার প্যারাবহুল বক্তব্য তুমি একাধিকার পড়তে।
“বল সেন্ডেল কিনতে যাবি।’’
“জুতা বললে কী সমস্যা?”
“জুতারে জুতা বলতে পারস। যেমনঃ শো। কিন্তু সেন্ডেলকে জুতা বলবি কেন?”
“সেন্ডেল তাহলে জুতা না।”
“না।” স্পষ্ট সিদ্ধান্ত দিলো আবির; তুমি ভাবলে সে তোমার সাথে যেতে চায় না বলে এমন বাহানার কথা বলছে, কিন্তু সে তোমার সাথে দোকানে গিয়ে দামাদামি করে বেল্ট লাগানো চটি কিনতে সাহায্য করার পরেও অনড় থাকলো;
“এগুলারে ত জুতা বলতে আপত্তি নেই তোর?”
“এগুলোও সেন্ডেল। জুতা না।” তোমার পারাপারহীন রাগ হলেও, জুতা আর সেন্ডেলের সংজ্ঞা নিয়ে তুমি বিভ্রান্ত ছিলে, তাই তর্ক করতে গরজ পেলে না; এরকমই পীড়াদায়ক অনুভূতি হয়েছিল আরেকদিন, যেদিন সে দুর্গা মূর্তি বা সামগ্রিকভাবে যেকোনো বিগ্রহ নিয়েই তর্ক তুলেছিল, নিজের ধর্মের স্বাভাবিকতা, বিজ্ঞানমুখিতা ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে; “ইসলাম ধর্মে অস্বাভাবিক অবৈজ্ঞানিক কোনো কিছুকে প্রশ্রয় দেয় না। অন্যান্য ধর্মের মতো।” সে বলেছিল নামাজ শেষ হওয়া মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে, তোমার সাথে কয়েকটা বাসন্তী পূজার মন্ডপ ঘুরে এসে; কোন ধর্ম শ্রেষ্ঠ, এসব নিয়ে ঝগড়া করার মানসিকতা পার করে গেছ, এমনটা মনে করতে—- তোমার কাছে তখন সকল ধর্মই সমানভাবে কাল্পনিক, তবু কথাটা এমন নিপীড়ক যে তুমি প্রশ্ন না করে থাকতে পারলে না, “যেমন?’’
সে যেন এরই অপেক্ষা করছিল, বললো “এই যেমন, তোদের দেবতার দশটা চারটা হাত; কারো হাতির মতো মাথা– এগুলি অস্বাভাবিক না! এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে?”
“তাহলে ইসলাম ধর্মে কোনো অবৈজ্ঞানিক ব্যাপার নেই?” মসজিদ থেকে বের হওয়া মুসল্লিদের প্রতি বিষ দৃষ্টিতে চেয়ে, তাকে জিজ্ঞেস করলে– যেহেতু মূর্তি নিয়ে তৎক্ষণাৎ তার কথাকে অস্বীকার করার যুক্তি পাচ্ছিলে না;
“না। এমন অস্বাভাবিক কিম্ভূত কিছু ইসলাম ধর্মে নেই।”
“অ। স্বর্গ-নরক তোর কাছে খুব স্বাভাবিক বিশ্বাসযোগ্য ঘটনা?”
“তা নয়তো কি? ভালো-মন্দের একটা ফলাফল থাকবে না! তুই যদি ভালো মন্দে বিশ্বাস করছ, যৌক্তিকভাবেই এর চূড়ান্ত পরিণতি হিসাবে মৃত্যু পরবর্তী জীবনের চিন্তা আসবেই। ভালো করলে পুরষ্কার আর খারাপ কাজের শস্তির বিধান এটা বিজ্ঞানসম্মত।”
এই ধরনের যুক্তিকে মোকাবিলা করার প্রতিষ্ঠিত প্রতিযুক্তি তোমার পড়া ছিল—- ঈশ্বর বলে কিছু যে আছেই এর প্রমাণ কি? থাকলেও এই অসীম মহাবিশ্বে মানুষের মতো তুচ্ছ একটা প্রাণি তার কাছে কেন এতো গুরুত্ব পাবে? আর যদি মানুষের ভালো-মন্দের বিচার করাই ঈশ্বরের ঈশ্বরত্বের লক্ষ্য হয়ে থাকে, তাহলে সে কি ক্ষমাপ্রবণ নাকি ন্যায়বিচারক?… ইত্যাদি বহুব্যবহৃত যুক্তি দেখিয়ে শেষে ধর্মের ভূগোলগত সীমাবদ্ধতা দিয়ে তাকে ঘায়েল করতে চাইলে, “কোরান যদি ভারতবর্ষে নাজিল হতো, তাহলে কি প্রবাহিত নদী আর ফলের বাগানের মতো মামুলি উপকরণ দিয়ে স্বর্গের কল্পনা করতো কেউ? আরব মরুভূমি বলেই, পানি আর বাগান এমন গুরুত্বপূর্ণ। স্বর্গ-নরক যে মানুষের কল্পনা এটা বুঝতে পারা এতো কঠিন নাকি? মূর্তিও তেমন মানবীয় কল্পনা। কোনোটারই অস্তিত্ব মানুষের কল্পনার বাইরে না।”
কথাগুলো খালাস করতে পেরে তুমি তৃপ্তি পেলে; তার মুখের রেখায় ফুটে উঠলো জ্বালাময়ী দ্বিধা, দুর্বল আত্মবিশ্বাসকে চাঙ্গা করানোর দুখি কসরত– স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছিল শিকড়ে তাগড়া নাড়া খেয়ে কিছু একটা ভারসাম্য হারাচ্ছে, যদিও সেটা স্বীকার না করে সে বললো “এমন না। জান্নাতে কেবল নদী আর ফলের বাগান আছে এমন না। তুই যেটা মনে মনে ইচ্ছা করবি সেটাই…”
“ধুরও! স্পষ্ট বুঝা যায়, এগুলা স্থূল কল্পনা।” তার কথা শেষ করতে দিলে না—- কাচের বাড়িতে বাস করে অন্যের বাসায় ঢিল ছোড়ার মতো বেকুব বলে মনে হয়নি তাকে; তুমি ওর এহেন মানসিকতার প্রতি যেমন বিরক্ত হলে একই সাথে এটা ভেবে আহলাদও পেলে যে তোমার বুদ্ধিবৃত্তিক স্তর তার থেকে উন্নত।
প্রায় সবকিছু নিয়ে ওর নির্দিষ্ট অভিমত থাকতো, যেটাকে সে যুক্তিতে ফুটিয়ে নিয়ে ত্রুটিমুক্ত ও সর্বজনীন মনে করতো– মাঝেমধ্যে তর্কে জিতে গেলেও বাস্তবে তার নির্ধারন করা রীতি-নীতির সাথে মানিয়ে চলতে হতো তোমাকে, যদিও কখনো তা অপমানজনক পরিস্থিতিতে ফেলে দিতো—- একদিন, আবির কাউসার বুলবুল সহ আরো কয়েকজন বয়স্য মিলে তোমরা ক্যান্টানমেট ঘুরতে গিয়েছিলে, ময়নামতি বাসস্ট্যান্ড থেকে ইস্পাহানী দেখা না গেলেও, এর তাপ এসে লাগছিল তোমার হৃদয়ে, তবু তুমি ভেবেছিলে সেই হীনমন্য দিনগুলো উতরে গেছ; তাই অন্য একজনের উল্লাসে তুমিও চিৎকার করে সায় দিয়েছিলে এই বলে যে, আজকে ক্যান্টানমেন্টের সবচে দামী রেস্ট্রুরেন্টে খাওয়া-দাওয়া হবে, আর বিল দিবে আবির; কেননা তারই পরিকল্পনা, উৎসাহ ও নেতৃত্বে সবাই এখানে আসতে রাজি হয়েছে—- এখন ওর কাছে পর্যাপ্ত টাকা আছে কিনা, সেটা বিবেচনা করা উচিত ছিল এবং সেও সরলভাবে তার অপারগতা মেনে নিতে পারতো, কিন্তু বিল দেওয়াকে সে চেলেঞ্জ হিসাবে নিয়ে বিস্ফোরক নিরবতায় তোমাদের পাশাপাশি চললো; অন্য একজন তাকে বেকায়দায় ফেলতে পারে এটা সে মেনে নিতো কিন্তু তুমি সেখানে সায় দেয়ায় সে আরো চেতে গেল, ফলে তোমার কথার উত্তর দিচ্ছিল না—- তুমি এর কারণ খুঁজে পেলে না; রেস্টুরেন্টে ঢুকে সে বুলবুলকে পাশে বসতে বললো, তুমি বুলবুলের আরেক পাশে বসাতে শুনতে পেলে সে তাকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করছে, ওর কাছে ধার দেয়ার মতো যথেষ্ট টাকা আছে কিনা! বুলবুল আশ্বস্থ করে বললো, “টাকা নিয়ে চিন্তা করো না।” তখনো তুমি ওর রুখা আচরণের কারণ চিনতে অসমর্থ্য রয়ে গেলে; পরোটা মাংস খাওয়ার ফাকে কাচের গ্লাসে একটু বেশি ঝুকে পানি খাওয়ার পর, আবির রুক্ষ্মভাবে তোমাকে বললো “এভাবে কেউ পানি খায়! গ্লাসে নাক ডুবাইয়্যা? গ্লাসের কাচে নিঃশ্বাসের দাগ লেগে রইছে। ডিজগাস্টিং।”
তুমি এই অভিযোগের কোনো উত্তর পেলে না; ওর শুচিবাই জানতে, দোকানে চা খেতে নিলে কাপের হ্যান্ডলের উপরের অংশে মুখ দিয়ে চুমুক দিতো সে—- যুক্তি ছিল “এইখানে কেউ মুখ দেয় না।” অতএব, গ্লাসে নিঃশ্বাসের দাগ নিয়ে তার খুতখুতানি স্বাভাবিক কিন্তু এজন্য সবার সামনে এভাবে বলবে! বুলবুল পরিবেশ স্বাভাবিক করতে গিয়ে আরো বেগলাইয়া দিল “তুমি অন্য গ্লাসে খাও। কয়েকটা গ্লাস আছে এখানে।”
“কথা সেটা না। সবকিছুর একটা ম্যানার আছে!” আবির বললো;
“আরে আমার ইংরেজের বাচ্চা! এতো নখরামি কেন তোমার?” কাউসারের কথায় সবাই হেসে উঠে সকলেই এক দুইটা ফানি বিশেষণ যোগ করতে লাগলে পরিবেশে সমতা আসলো, কিন্তু অপমানটা তোমার হজম হয়নি; ক্যান্টনমেন্ট থেকে ফিরে আসার পরেও থেমে থেমে রক্তে ভিজে যাওয়া জখমের মতো তোমাকে পীড়া দিতে লাগলে, তুমি সন্ধ্যায় ওকে চিঠি লিখতে বসলেঃ
….না। তোমার কালো গ্লাসে ঘেড়া দামী রেস্টুরেন্টে খাবার খাওয়ার আর্থিক ও আচরণগত সঙ্গতি নেই। তুমি নিতান্ত বেকুব, বলে ওদের সাথে খানা খেতে বসেছিলে। আসলেই তোমার বড়লোকি ম্যানার নেই। যাদের আছে, তারা যেন তোমাকে আর এমন অভিজাত রেষ্টুরেন্টে সাথে করে না নিয়ে যায়! যেহেতু তুমি পানি খাওয়ার সহবতও জানো না…..
চিঠিটা লিখে হালকা বোধ করলে এবং লেখাটার একটা নাম দিলে– কাচের গ্লাসে নিঃশ্বাসের দাগ; কিন্তু এরপরেও ওর এমন কড়া কথা বলার পেছনের সুনির্দিষ্ট কারণটি তুমি চিন্তা করে বের করতে পারোনি।
চিঠিটি দেয়ার পর ওর প্রতিক্রিয়া নিয়ে আর ভাবতে চাইলে না; সে তোমার আত্মবিলাপ পড়ে দুখি হলো, তোমাকে লিখলো… আমরা মিডলক্লাস। দামী রেস্টুরেন্টে খাওয়ার সামর্থ আমারো নেই। আমার কথায় তুই এতো কষ্ট পাবি আমি বুঝতে পারিনি। আমি খুবই সরি। আমি ততো ভেবে বলিনি। তুই ত জানোস, আমি হুটহাট একটা কথা বলে ফেলি। তোর মতো এতো সূক্ষ্মভাবে ভাবি না। আমি আবারো সরি।… এইভাবে সে প্রথম স্বীকার করলো, তোমার থেকে সে কম ভাবুক, বহির্মুখ এবং অস্থির; তার চিঠি পেয়ে তোমার কাছে এটা ভালো লাগলো যে বাইরে নিজেকে স্মার্ট এবং বোল্ড দেখাতে চাইলেও ভিতরে ভিতরে সে তোমার অতি সংবেদনশীলতাকে শ্রদ্ধা করে এবং তার কাছে তোমার জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে—- নাহলে সে একাধিকবার সরি বলতো না; সেইমুহুর্তেই, কলেজে চিঠিটা পাওয়ার পর, তার প্রতি জমে থাকা মেঘ কেটে গেল এবং আবারো কারো কাছে নিভৃতে জিতে গেলে, বাইরে সেই জয় ঘোষণার প্রয়োজন নেই—- গেইটে ওর সাইকেলের বেইল বাজলে দৌড়ে গিয়ে দেখলে, তার মুখমন্ডলে অপরাধবোধের এক কণাও নেই; “উঠ।” তুমিও বিনা প্রশ্নে পিছে বসে বললে “আজকে পার্কে যামু না।”
“কই যাইতে চাস।”
“চল, দাদার দোকানে যাই।”
“তোর জাভেদ ভাইর প্যারপ্যারি আমার ভালো লাগে না।” বলার পরে আবার বললো “আইচ্ছা চল।”
আশেপাশের দোকানগুলো পাকা হয়ে গেছে, বহুদিন আগেই– এখানে এখনো বাশের পালা আর মাটির ঢেউ খেলানো মেঝের উপর পুরোনো আহত কাঠের বেঞ্চে এসে বসতো, শহরের সাংস্কৃতিক কর্মী, বাম রাজনৈতিক দলের সদস্য, কবি, বেকার, গুণগ্রাহী তরুণ-তরুণী… এছাড়াও আরো অভিধাহীন লোকজনের আনাগোনায় বিকেল থেকে সন্ধ্যাটা জমজমাট থাকতো; সামনের দিকে একটা কাচের আলমারিতে বাসি লুচি, গজা বা সিঙ্গারা অল্পস্বল্প সাজানো থাকলেও, কদাচিৎ কেউ এসবের অর্ডার দিতো; মুহুর্মুহু চা আর অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী পাইলটের আনা-নেয়া চলতেই থাকতো– পাইলট হলো খালি কাপ, রেওয়াজটা এমন যে প্রায় বেশিরভাগ আড্ডারু খরিদ্দার এক কাপ চা দুইজনে ভাগ করে পান করতো; জাভেদ ভাই একটা বড় বেঞ্চের কোণা প্রায় সারাদিনের জন্য দখল করে রাখতেন, উর্দু কিতাবের স্তুপ বা দর্শনের বই সর্বদা হাতের নাগালে মজুত রেখে; অন্যরা আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকলেও, উনি নতুন আসা কারো সাথে আলাপচারিতা, কেউ না থাকলে খুটিয়ে দর্শনের বই পড়া বা শায়েরি পড়তে পড়তে অনুবাদ করে শুনানো, কখনো আবৃত্তি করা, কোনো দর্শনার্থীর নির্দিষ্ট সমস্যা শোনা ও নিরপেক্ষ দার্শনিক সমাধান যোগানো বা দীর্ঘ রসটম্বুর কথামালা দ্বারা দাদার দোকান আচ্ছন্ন করে রাখতেন; দোকানের মালিক সকলের দাদা—- জাভেদ ভাই ছাড়া অন্যদের দীর্ঘ সময় আসন দখল করে বসে থাকাকে বিরক্তিসূচক দৃষ্টিতে দেখতেন, যেজন্য হয় একটু পর পর চা অর্ডার করতে হতো অথবা কিছু সময়ের জন্য আসন ছেড়ে দিয়ে ঘুরে আসতো রানীর দীঘির পার বা নিউমার্কেট, ফিরে আবার এসে বসতো খালি কোনো আসনে, অর্ডার দিতো এক কাপ চা আর একটা পাইলট; নতুন কাউকে এখানে নিয়ে আসাকে নিরব প্রশংসার চোখে দেখা হতো– আবিরকে নিয়ে আসলে জাভেদ ভাই, অকৃপণ হাসিতে তোমাদের আপ্যায়ন করে বললো “স্যার আসছেন। সাথে কে? বন্ধু! আগে দেখিনি!”
“দেখছেন। আরো একবার আসছিল সে। আবির।” তোমার গর্ব হচ্ছিল পরিচয় করাতে– আবিরও দেখুক, এখানে এই বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে তোমার একটা অবস্থান আছে, যদিও জাভেদ ভাই আর বিসাকের ৩/৪ জন সদস্য ছাড়া অন্য সংগঠনের কারো সাথে তোমার সরাসরি কথা হতো না, তবু তাদের আলাপ তুমি শুনতে, বিতর্ক উপভোগ করতে, কিন্তু কেন্দ্রীয় আকর্ষণ জাভেদ ভাইকে এড়িয়ে অন্যকেউ হতো না কখনো; “তারপর, আবির! আপনারা একই কলেজে পড়েন?”
আবির কিছুটা লজ্জা পেল “আমাকে আপনি বলছেন কেন? আমি আপনার থেকে অনেক ছোট।”
“বয়স দিয়ে কাউকে বিচার করার পক্ষে না আমি। কিন্তু সম্ভাষণ ত পালটায়ই। আমাদের শুক্রবারের পাঠচক্রে আসেন, বন্ধুর সাথে; অন্যকোনো জরুরী কাজ না থাকলে।”
“আমাদের বাসা ত অনেক দূর। শহরের শেষ প্রান্তে।”
“শহরের মধ্যেই ত! শহরের বাইরে থেকেও আমাদের পাঠচক্রে লোকজন আসে। ঢাকা-চট্রগ্রাম থেকে চলে আসে পুরোনো সদস্যরা। দূরত্বটা মনের না হলে, মাইলের দূরত্বে সমস্যা হওয়ার কথা না। চলে আসেন কোনো শুক্রবার!” চশমার মোটা কাচের আড়ালে ওর ক্লান্ত ঘোলাটে চোখ দুটির মাঝেও ঝকঝকে ভাব ফুটে উঠলো অল্প সময়ের জন্য;
“যাবো।” বললো আবির; জাভেদ ভাই আবার মগ্ন হলেন অর্ধপঠিত পুস্তকে, কিন্তু কানদুটো খাড়া রইলো নতুন কোনো মানুষ ও ঘটনার দিকে; একটু পর সুমন ভাই ঢুকলেন এবং তোমাদের বেঞ্চে এসে বসে, তোমাকে দেখে একটু হাসলেন “কী খবর?” উনাকে পেয়ে তোমারও ভালো লাগলো, “আবৃত্তি মঞ্চ থেকে আসলেন?’’ জিগাইলে তুমি; “হ্যা।” বলে ও নিজ উদ্যোগে আবিরের সাথেও পরিচিত হলেন, শেষে পাঠরত জাভেদ ভাইকে জিজ্ঞেস করলেন “কেমন আছেন?” জবাবে খানিক সময় নিয়ে বই থেকে মাথা তুলতে তুলতে বলা শুরু করলেন এবং শেষ প্রশ্নটা করার সময় সরাসরি সুমন ভাইর চোখের দিকে চাইলেন; “যেমন দেখছ। খেয়ে-পড়ে বেচে আছি। পড়া বলতে পোশাকের কথা বলছি না। বই পড়ার কথা বলছি। হতে পারে পোশাক মৌলিক প্রয়োজন। কিন্তু সবার মৌলিক প্রয়োজন এক হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। তোমাকে যে অনুবাদের কাজটা দিয়েছিলাম, কদ্দুর করলে?” উনার কথায় হালকা রুষ্ট ভাব;
“বইটা নিয়ে বসারই সময় পাইনি। কিছুদিনের মধ্যে করে ফেলবো।”
“কিছুদিন বলতে কতোদিন? কিছুদিন বলতে, ১ সপ্তাহও বোঝায় ১ মাসও বোঝায় আবার ১ বছরও বোঝায়। ভুল করে হলেও নির্দিষ্ট করে বলো। অনির্দিষ্ট সত্যের চেয়ে নির্দিষ্ট মিথ্যা অনেক ভালো। তোমার এই কিছুদিনকে দয়া করে নির্দিষ্টতা প্রদান করো।”
সুমনভাই বললেন “১৫ দিন।”
“বেশ। এক পক্ষ। তোমরা চা খাবে?”
“আমি খাওয়াই।” আবির প্রস্তাব করলো;
“না। অন্যদিন খাওয়ালে আপত্তি করবো না। আজ না।” বলে ২ কাপ চাপ ও ২ টি পাইলটের অর্ডার দিলেন; চা খাওয়ার পর আবির তোমার কানে কানে বলিলো “চল। বেরুই।”
তুমিও আপত্তি করলে না; জাভেদ ভাইয়ের থেকে বিদায় নিয়ে সুমন ভাইকে বললে “আপনি থাকবেন আরো।”
“না। চলো। একসাথে কিছুদূর যাই।” বলে তিনিও তোমাদের সাথে উঠলেন; পথে বেড়িয়ে আবির সাইকেল ধরে তোমাদের পাশাপাশি হাটতে হাটতে বললো “জাভেদ ভাই যে বললেন, উনি কেবল খেয়ে-পড়ে আছেন, তার মানে কি উনি ন্যাংটা আছেন?”
“হাহা। জোক অফ দা ডে।” হাসি মুখ নিয়ে সুমন ভাই বললেন; আবির আরো বললো “সহজ জিনিসকে জটিল করে বলা উনার স্বভাব নাকি!”
“জিনিয়াসরা এরকমই। তাদের মস্তিষ্ক সারাক্ষণ ক্রিয়েটিভ থাকে কিনা।”
বলতে বলতে রাস্তার বিচ্ছেদ বিন্দু চলে এলে, সুমন ভাইর থেকে বিদায় নিয়ে তুমি আবার আবিরের সাইকেলের পিছে চড়ে বসলে; “জাভেদ ভাইর মধ্যে যে তোরা কি পাইছস, তোরাই জানস।” সে প্যাডেলে চাপ দিতে দিতে বললো; তুমি পিছনে বসে ওর কথা শুনতে পেলে না “কী বললি?”
“কিছু না।” সাইকেল এগিয়ে চললো বিস্তর গতিতে রাস্তা খালি পেয়ে।
অসময়ের অশান্তিকর বাদলা দিন, দুপুর আর বিকালের তফাৎ থাকে না; খাটে বসে বসে বাসার সবাইকে ঘুম ও আলস্যে মজে থাকতে দেখে দেখে তোমার হৃদয় একটু উষ্ণতার জন্য চারিদিকে চাইলো– কারেন্ট নেই, মামী মাসি দিদিমা নিজ নিজ খাটে তেনা হয়ে আছে, তুমি মাথার পিছে দুই হাত নিয়ে বুলবুলকে নিয়ে ভাবতে থাকলে– তার হাসি তার চশমা তার শান্ত কপাল, ভদ্র করে আচড়ানো চুল… কিন্তু তাকে স্পর্শ করার অনধিকার, পৌছতে না পারার নিরাশা… হঠাৎ মাথার মধ্যে একটা পাগলাটে চিন্তা খেলে গেল; দুয়েকদিনের ভিতর বন্ধুত্ব দিবস, সেই উপলক্ষে ওদের জন্য গিফট কেনা যায় তো! নিঃসন্দেহে বইও দিবে– আবিরের জন্য একটা সাইন্সফিকশান বই আর বুলবুলের জন্য… তোমার পঠিত সকল সাহিত্য নির্যাস একলগে দিয়ে দেয়ার আবেগ জাগলো, বাস্তবে তা সম্ভব নয়; এটাই একটা মধুর ভাবনা, কী কী বই তাকে দেয়া যায়, সেটা নিয়ে চিন্তা করা বইয়ের দোকানে দাঁড়িয়ে; ভাবনাটা একটু রুপ পেতেই তুমি চট করে বিছানা থেকে ওঠে রেডি হয়ে নিলে, একটা ছাতা নিয়ে ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মধ্যেই কান্দিরপাড় বইয়ের দোকানের উদ্দেশে যেতে লাগলে; বৃষ্টির দিন, ক্রেতা প্রায় নেই; দোকানের পরিসর আজকে বিস্তর ফাঁকা—- প্রথমে আবিরের জন্য সাইন্স ফিকশান বই খুজতে লাগলে, বিদেশি রাইটারের অনুবাদ; কিছুক্ষণ ঘাটাঘাটির পর, একটা বই বেছে নিলে—- ভীন গ্রহের আগুন্তুক, যদিও প্রচ্ছদটা ততো পছন্দ হয়নি তোমার– আবিরের পছন্দ হতেও পারে! আর যেহেতু অন্য ভাষা থেকে অনুবাদ হয়ে এসেছে, এর একটা মান ত থাকবেই; ফ্ল্যাপেও ত ভালো ভালো কথাই লেখা; বেশি ভাবনাচিন্তা না করে, হাতের সামনে চলে আসা পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের লেখকদের সাইন্সফিকশান বই এড়িয়ে, উগ্র রঙ আর আজগুবি আকৃতি আকা মলাটের বইটি আবিরের জন্য নিয়ে নিলে;
বুলবুলের জন্য কী কী বই নিবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলে না; যতোগুলি দোকান ছিল, জিলাস্কুল রোডে, প্রতিটা দোকানের সামনের দুইপাশের তাকে সাজানো বইগুলি কয়েকবার করে দেখেও সঠিক বইগুলো নির্বাচন করতে পারছিলে না– কবিতার বই দিবে নাকি উপন্যাস! না! অপরীক্ষিত কোনো লেখকের বই তাকে দিবে না, এটা মনস্ত করলে; তবে তার নরম মনের সাথে সামঞ্জস্য খায় এমন বই কোনগুলো! বাছবিচার করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে এলো; কারেন্ট এসে গেলে, রাস্তায় জমে থাকা পানির উপর দোকানের আলো প্রতিফলিত হয়ে চকচক করছিল, যেন বাসায় ফেরার নিঃশব্দ ডাক তোমার মনে ধ্বনিত হতে লাগলো… বুঝতে পারলে, সঠিক বই কোনোদিন পাবে না; শেষে হাতের কাছে যে বইগুলো কার্যকর মনে হলো নিয়ে নিলে– যেহেতু, প্রেম ও প্রেমের যাতনা সম্পর্কে সে বুঝুক এটা চাইতে সেজন্য শরতচন্দ্রের দেবদাস রাখলে, এরপর মনে হলো, রবি ঠাকুরের গীতাঞ্জলি বাদ দেয়াই যায় না, এতো নিবেদন আর কোথায় আছে! সেটাও নিলে রবীন্দ্রনাথের জলছাপ মুখচ্ছবি আকা প্রচ্ছদের; আর একটা বই না দিলে সম্পূর্ণতা আসছিল না; কিন্তু কার বই দিবে? বঙ্কিম? না। সে খুব নীতিবাগীশ। সুকান্ত! দেয়া যায়, কিন্তু জীবনানন্দের রুপসী বাংলা বইটার প্রচ্ছদ ভালো লেগে গেল– নৌকায় বসে একটা মেয়ে বিল থেকে শাপলা তুলছিল; এটাও ত প্রখ্যাত বই—- দেয়া যায়; এইভাবে ওর জন্য তিনটি বই কিনে ফেললে; পাশে খাতা-কলমের দোকান থেকে দুটি ফিতাও কিনলে গিফটের মতো করে বেধে দিতে;
বাসায় ফিরে, বারবার বইগুলি নেড়ে-চেড়ে দেখতে লাগলে—- পড়ার টেবিলে বইগুলি সাজিয়ে রেখে, চেয়ারে বসে আবারো দেখতে দেখতে মনে হলো, উপহারের সাথে ত চিঠি দেয়াই যায়; আবিরকে ত হিসাবের চিঠি লিখতেই—- সেটা শুভেচ্ছা ও উপহার চিন্তার উৎস নিয়ে লিখতে লিখতে ভাব ফুরিয়ে গেল, শেষে লিখলে সেও তোমার জীবনে একটা ভালো বন্ধু; চিঠি শেষ করে সেটা আবিরর বইয়ের ভিতরে ভাজ করে রাখলে, এরপর বুলবুলকে লিখতে শুরু করলে– কী লিখবে, বুঝে পাচ্ছিলে না, পরে তোমার মনের অস্থিরতার কথা কিছু লাইনে লিখলে, আর সেই যাতনায় শরীরের এক উগ্র প্রতিক্রিয়ার কথা লিখলে– বমনেচ্ছা; যেন, এই সমাজের কীর্তিকলাপ তোমাকে খুবই পীড়িত করছে, এলোমেলো করে দিচ্ছে, আর মানুষের রুঢ়তা, নীচতা, ইতরামি এবং সাথে গুজে দিলে অবহেলা– এসবের কারণে তোমার তীব্র বমনেচ্ছা জাগে, সমাজের গ্লানি উগড়ে দিতে; অর্থাৎ ওর কাছে নিজেকে একজন বিজ্ঞ সমাজসচেতন ও সংবেদী মানুষ হিসাবে উপস্থাপন করে, একই সাথে আবেগ লুকিয়ে আবেগ প্রকাশ করার একটা সম্মানজনক ভঙ্গি আবিষ্কার করলে—- চিঠি শেষ করে মনে হলো, হ্যা! এই চিঠি এই উপহারের সাথে খাপ খায়, একটা সর্বজনীন উপলক্ষে—- সারাটা সন্ধ্যা এসব করতে করতে, আকাশ থেকে কুয়াশার মতো তৃপ্তি নামিয়ে আনলে, তোমার উষ্ণ বোধ হলো;
যদিও তুমি আশা করোনি, তবু আবির তোমাকে রিটার্ন গিফট দিয়েছিল– একটা চকোলেট; আর সে সবার জন্যই নিয়েছিল, বুলবুল ও কাউসার, ওদের জন্যও; পরে অবশ্য বই পড়ে সে ভীষণ হতাশ হয়েছিল, কারণ এটা খুবই স্থূল কল্পনার বই, এমনকি ভালো সাইন্স ফেন্টাসিও নয়; তার ভাষায়, সেটা ছিল ডিজাস্টার, এরচে ভালো হতো জাফর ইকবালের না পড়া নতুন কোনো বই যদি দিতে, তাতে বরং পয়সা উসুল হতো; বুলবুল, বই নিলো—- উপরের বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠায় ভাজ করা চিঠিও নিশ্চয় পড়েছিল, কিন্তু সে কিছুই বললো না; তার হাসির নৈর্ব্যক্তিকতা এর অন্তর্গত নিষ্ঠুরতায় চিঠি উপহার সময় আবেগ… সবকিছুকে গ্রাস করে নিলো কৃষ্ণগহ্বরের মতো, যেখান থেকে কিছুই ফিরে আসে না– সেই রুপবান হলুদ শিখা সকল আহুতি গ্রহণ করে হাসতে থাকে দুর্বিসহ উজ্জ্বলতায়।
আবির সাধারণত একা আসলেও বুলবুল তার মধ্যেই কোথাও জড়িয়ে থাকতো; আবির বুলবুল কাউসার, এদের যেকোনো একজন অন্য দুজনকেও বয়ে নিয়ে আসতো– এদের স্বাতন্ত্র মানতে চাইতো না তোমার মন; কাউসার ছিল সবচে নৈর্ব্যক্তিক, যার মধ্যে অন্য দুজন প্রতিফলিত হতো বলেই তার অস্তিত্বের মূল্য; তুমি জানতে বুলবুল কোনোদিন তোমার জন্য আসবে না, সে আসবে আবিরের সাথে, তবু তুমি কল্পনা করতে সে কোনোদিন একা কেবল তোমার সাথে দেখা করতে এসেছে এবং একদিন সেটা ঘটেছিল; যেদিন আবির আসতো না বা তার আসার সময় হওয়ার আগেই তুমি শাকতলা থেকে পার্কে যাওয়ার রাস্তাটার অনেকখানি অংশ হেটে আসতে, প্রত্যেকটা চলাচলরত যান খেয়াল করে; কেননা তোমার বাসায় না আসলেও বুলবুল এই রাস্তা দিয়ে প্রায় প্রতিদিনই শহররের কেন্দ্রে যেতো, ওর হলুদ চাকার সাইকেলে চড়ে—- ওর অলক্ষ্যে তাকে এক ঝলক দেখে নেয়ার তৃষ্ণায় তুমি হাটতে এলোমেলো; একদিন সে তোমাকে দেখে ফেলেছিল অবিন্যস্ত অস্থির অবস্থায়, এবং তুমি তাকে দেখেও না দেখার ভান করে এগিয়ে গিয়েছিলে সামনে, সে তোমাকে দেখে সাইকেলের গতি কমিয়েছিল, যদিও তোমাকে ডাকেনি; পরে আবিরের কাছে বলেছিল৷ “ওর কি হইছে? এমন পাগলের মতো হাটে কেন?”
আবিরের থেকে এই তথ্য জেনে তুমি আরো বেশি পাগলের মতো হাটতে লাগলে, যেন বারবার ওর নজরে পড়ো; এমন যখন চলছিল, তখন তুমি প্রায় প্রতিদিনই রাস্তায় একা বেড়িয়ে যেতে, আবির তোমাকে বাসায় না পেয়ে একলাই চলে যেত পার্কে; একদিন তুমি হাটা শেষ করে বাসায় এসে শুনতে পেলে কে যেন তোমার সাথে দেখা করতে এসেছিল, তোমাকে না পেয়ে এইমাত্র চলে গেছে; তুমি ভাবলে আবির এসেছিল, কিন্তু তখনি মামি বললো আবার “সুন্দর কইরা যেই ছেলেটা প্রায়ই আসে, সে না। অন্য একটা ছেলে। ফর্সা করে।” শুনে তোমার হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল, “এক্ষণ গেছে?” “হ্যা। তুমি দেখছ না পথে?” “না।” বলে তুমি আবার গলি ধরে রাস্তার দিকে যেতে লাগলে, কয়েক কাইক হেটে মনে হচ্ছিল পর্যাপ্ত নয়, তখন তুমি দৌড়াতে লাগলে– গলির মধ্যেই এবং রাস্তায় উঠার আগেই দেখলে, বুলবুল আবার তোমাদের বাসার দিকেই আসছে, একাকী সাইকেলে চড়ে– যেমন তুমি চেয়েছিলে; দুইজনই থামলে; ও সাইকেল থেকে নেমে বললো “খবর কী?” লজ্জায় কিছু বলতে পারছিলে না; নিশ্চই সে বুঝেই নিয়েছে তুমি ওর জন্যই দৌড়াচ্ছিলে; এই উদ্বেগ ওর কাছে প্রকাশিত হয়ে যাক, তুমি চাওনি; তুমি তাকে বললে “বাসায় আসো।” সে মানা করলো, “বাসায় যাব না। তুমি বের হও।”
সেদিন তার সাথে আশেপাশে ঘুরেছিলে, যেহেতু তোমার সাইকেল ছিল না এবং সেও ডাবলিং চালাতে পারে না; বেশিক্ষণ থাকেনি; বিশেষ কোনো কথাও হয়নি; একটা দোকানে বসে চা খেয়েছিলে, একফাঁকে সে জিজ্ঞেস করেছিল “পার্কে যাওনা এখন, আবিরের সাথে।” “কম যাই।’’ বলেছিলে তুমি; “কেন?” “ভালো লাগে না।” তোমার পুরোনো উত্তর; চা খাওয়া শেষ হলে সে তোমাদের এলাকার রাস্তাগুলো নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, এটা কোথায় গিয়েছে, সেটা কোথায় গিয়েছে? তুমিও যথাসম্ভব উত্তর দিয়েছিলে; অবশেষে সে বললো “আচ্ছা। যাই আজকে। ভালো থাকো। আবার দেখা হবে।”
সে চলে যাওয়ার পরও তুমি অনেক্ষণ গলির ম্যড়ে দাড়িয়েছিলে– কেন কেউ আসে? কেন কেউ যায়? কেন কেউ ঠিকমতো আসে না? কেন তুমি কারো ঠিকমতো আসার জন্য প্রস্তুত থাকো না? কেন এইসব ঘটে? ঘটতেই থাকে?
এরপর সে আরো অনেকবার আবিরের সাথে এসেছিল, তোমাদের বাসায়– ঘুরতে যেতে, নিমন্ত্রণ খেতে, কিন্তু কোনোদিন একা আসেনি আর।
Leave a Reply