উৎসর্গ: আমার শ্রেষ্ঠ শ্রেয়সী ও বন্ধু- আমার আত্মজা সাথীকে
আকাশের মেঘগুলো এলোমেলো হয়ে এলে যেমন পিঁপড়েগুলোর চাঞ্চল্য বাড়ে, তেমনি আমিও আরো এলোমেলো হয়ে পড়ি। আমার আশপাশে উদীয়মান এবং বিলীয়মান ঘৃণা আমাকে জাপটে ধরে। আমি তার সাথে যুঝি। আমি বুঝি ঘৃণা পেরে উঠবে না আমার সাথে কখনো। সকল ঘৃণার গলা টিপে ভালোবাসার ছায়া একদিন আমি এনে দেবো এ সকল ঠিক জানা থাকে। তবু ঘৃণার সাথে যুঝতে যুঝতে আমি কখনো কখনো বড্ড ক্লান্ত হয়ে উঠি।
ক্লাসঘর থেকে আমার ছুটি নেই। অনেক বিষয়যায় জানা বাকী। অনেক নৈর্ব্যক্তিক কথার মাঝে অনেক বেশী কুয়াশা জমে থাকে। কুয়াশায় আনন্দ আছে। কুয়াশায় আনন্দ থাকে। তবু রোদ, তার পিছে পিছে ঘুরে আমি ক্লান্ত হইনা কখনো। শ্রান্ত হইনা কখনো। কারণ জানি এই রোদেরই একদিন শ্রাদ্ধ হবে আমার। আমি হাঁটতে থাকি। খুব বেশী দূর হেঁটে যেতে পারি না। অনেকের জীবনে কেন্দ্র হয়ে ওঠা হয়, অনেকের বিন্দু। কিছুই হইনা আমি। নাথিংনেস জড়িয়ে থাকে আমাকে। সবকিছু হই হই করে হয়ে ওঠনা। এই যাতনা আমার দীর্ঘকালের। এ যেন বিধিলিপি। তার জন্য দায়ী আমি নিজে।
দেহ ও মন এক হয়ে মিশে গেলে যে অন্ধকার তৈরী হয়-সে অন্ধকারে গজিয়ে ওঠে প্রেম। সেই অন্ধকারে পৃথিবী বড়ো সচ্ছল হবে একদিন আমি জানি। তাই অন্ধকার আরো ঘণীভূত করে যেতে পারি। এইটুকু পারার ভেতর কৃতিত্ব নেই কোনো। এ আমার সরল দোষ। এ আমি করে যেতে থাকি।
হাসি ও কান্না একসাথে দীর্ঘায়িত হতে থাকলে পৃথিবীতে নতুন অনুভূতি জন্ম নেবে বলে তালগোল পাকানোটা খুব বেশী ভালো লাগে। যেমন, মিথ্যে আমি বরাবর খুব বেশী বলি না। প্রমাণ চাইলে ধরিয়ে দিতে পারি! যেমন, তাল গোল-ই হয়। সুতরাং এ সকল সত্য অনুভূতি নিয়ে বেঁচে যাবো আমি আরো কিছু অসুস্থ সময়। পৃথিবীতে চলে গেলে ক্ষতি বেশি নেই। চলে যাওয়া ভালো। তাই প্রলম্বিত সময়ে শোকের আয়ু বড়ো কম পৃথিবীতে। আমি তাই দীর্ঘায়ু মৃত্যু খুঁজি। আর নিজের কাছে হেরে যাই বারবার। পৃথিবীতে হেরে গেলে ক্ষমা নেই। ক্ষতিও নেই। অনেক ভুল আত্মপ্রসাদে বেঁচে থাকে মানুষ। আমিও বেঁচে যাবো। বেঁচে থাকার জন্য আত্মপ্রসাদ জরুরী।
ক্ষমা ছাড়া পৃথিবীর তৃপ্তি নেই। ক্ষমাহীন পৃথিবীতে এখন তাই অতৃপ্তির আবাস। তার ভেতর আমার গৃহ নেই কোন। আমি তাই পথিক। মাঝে মাঝে ঘর থেকে ডাক দেয় কেউ। বলে, “আমিও পথিক হবো!” অথচ আমি জানি তৃপ্তির প্রসাদ বিষাদে ঘেরা। আমি তাই কাউকে আর ডাকিনা। একা একা হেঁটে যেতে থাকি। একা থাকার ভেতর স্বস্তি আছে অনেক। যদিও সুখের কথা ভেবেছেন অনেকে। আমি ভাবিনা। কারণ গভীর অস্বস্তির সময় এখন। আগে তাই দরকার স্বস্তিকর স্বচ্ছলতা। কিন্তু কী ভাবে আমি তা জানিনা। জানিনা তাই খুঁজি। খুঁজি দীর্ঘি- পানকৌড়ি-শ্যাওলা ভরা গভীর প্রশান্তি। জলের রোদের ভেতর ঘুম যাবার দীর্ঘ প্রসাদ।
অথচ সব নিথর এখানে-একে কী শান্ত বলে? অথবা শান্তি? বোবাত্ব কী নীরবতা? গোঙানি কি কোনো গান হতে পারে? জানিনা। জানিনা তাই খুঁজি। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুর। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানবিক বিনির্মাণের দীঘল স্বপ্ন প্রতিরাতে টুকরো টুকরো করে দেখি। অথচ ভাষা নেই। বোঝাবার কোনো ভাষা নেই। এ অক্ষমতা নিয়ে হঠাৎ খিচুনি দেয়, খিস্তি খেউড়- আতকে উঠে যারা তাদের সত্যতা বড় বেশী নগ্ন হয়ে উঠে বলে বড় ভয়- সবকিছু ভেঙে পড়ে। অথচ টিকে থাকার কী দীর্ঘ প্রলম্বিত বাসনা আহা! বড্ডো বেশী ক্ষয় ঠেকাতে ঠেকাতে পারঙ্গম বড্ডো বেশী লজ্জা ঢাকতে ঢাকতে অসঙ্গগ্ন এ পৃথিবী একা হয়ে পড়ে। এ পৃথিবীর মন আমি বুঝিনা। আমার এ সময় ক্ষয়ে, ক্ষয়ে বুড়ো পুরুষের মত ঝরে পড়ে। আমি তার সার খুঁজে পাইনা। সব বিক্ষিপ্ত-তিন, পাঁচ অথবা শূন্য যার লাগি এক কেঁদে মরে আজীবন, এক নাকি গুরু অথবা সে শূন্য। আমি পৃথিবীর সব সংখ্যা ভালোবাসি। আমার তাই কান্না বেশী। আমি তাই কাঁদি। অথচ আমার শরীরে পৃথিবীর ঘৃণার আবাস। আমি ঘৃণা নই। আমি নগ্ন। আমি অরণ্য। আমি আদিম।
Leave a Reply