নুরুন্নাহার শাতলা পড়া সিঁড়ি বেয়ে ঘরের বাইরে আসে। কি জন্য যেন তার ভালো লাগে না। না, ভালো লাগে না বলা যায় না। কোথায় একটা অস্থিরতা- না, তাও না- আনমনা? উদাস? ভাব?- হ্যাঁ মনে একটা ভাবের উদয় হয়। কিন্তু সেটা কি, নুরুন্নাহার জানে না- বোঝে না। বুঝতে চেষ্টা করে- কিন্তু সবটা মেলাতে পারে না। এই বুড়ো শরীরটা হেলিয়ে দুলিয়ে দুই হাত মৃদু নেড়ে বাতাসের সঙ্গে মিতালী করে একটু একটু করে এগিয়ে যাবার সময় মনে হয়- হ্যাঁ তার মনে একটা নতুন ভাব এসেছে। হঠাৎ দখিনা বাতাস এসে সামনের কাঁচাপাকা চুল কয়টি যখন উড়িয়ে দেয়, গোষ্মটা সরিয়ে দেয়- গলার দুধে আলতা বরণ গলার হারের সোনালী রঙে নেচে ওঠে তখন নুরুন্নাহারের মনের ভাব মনে হয় গাড় হয়ে ওঠে। এটা ভাবতে ভাবতে কখন পুকুর পাড়ে এসে পড়ে। গাবপাতার মতো পুকুরের পানি। পূব পাড় আর উত্তর পাড় গাছ-গাছড়ায় জঙ্গল, দক্ষিণ পাড়- যেখানে নুরুন্নাহার দাঁড়িয়ে রয়েছে- এখানে আসা যাওয়া করা যায়, পশ্চিম পাড়ে বসত ভিটা। ‘এই বাড়ী!’ নুরুন্নাহার এইটুকু বলে থেমে যায়। না, থেমে যায় না- ভেতরে ভেতরে নাও দৌড়ের রঙিন নাও বাইতে থাকে। সেই নাও কই যায়?- নুরুন্নাহার নিজেও বলতে পারে না। এই বাড়ীতে তার জন্ম- এই বাড়ীতেই বিয়ে- এই বাড়ীতেই যৌবন- সংসার। এই বাড়ীতে………… পুকুরের পূর্বপাড়ে ঐ যে রনাক গাছটা দেখা যায়- ওখানেই তার স্বামীর কবর। সেই কবে থেকে ওখানে শুয়ে আছে। নুরুন্নাহারের ভাবটা অনেকটা পানসে হয়ে যায়। না, নুরুন্নাহারের ওদিকে আর চায় না। হাঁটতে হাঁটতে একটা কড়ুই গাছের কাছে এসে যখন দাঁড়ায় তখন মনে চায় গাছটার গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়াতে। ঠেস দিতে গিয়েও দেয় না। না, মানাবে না। একবার, সেটা যৌবনে- একথা ভাবতেই দখিনা বাতাস হু হু করে তার মনকে উড়িয়ে দেয়- এই গাছটার সাথে দাঁড়িয়েছিল নুরুন্নাহার। তখন হঠাৎ করেই তার স্বামী এসে তাকে পেছন থেকে আগলে ধরে। নুরুন্নাহারের সেকি হাসি! তার আবারও মনে চায় গাছটায় ঠেস দিয়ে দাঁড়াতে- শরীরটাকে কয়েক ভাঁজ করে পুকুরের পানির দিকে অপলক চেয়ে থাকতে- কিন্তু হয় না। পুকুরের ঢেউ খেলানো পানি দেখে তার মনের ভাবটা আবার নড়ে ওঠে। একটা সময় ছিল গোসল করার সময় নুরুন্নাহার পুকুরে নামলে সাঁতরিয়ে পুকুরের মাঝে চলে যেত। সাঁতার কেটে মনের খুশি শেষ করতে পারত না। কিন্তু স্বামীর সংসার হওয়ার পর কোথায় গেল সেই আনন্দ- সেই উচ্ছলতা? ছয় ছয়টি বাচ্চা হল, তাদের লালন-পালন, লেখাপড়া, খাওয়া-দাওয়া, সংসার সামলানো…….! নুরুন্নাহারের মনের সেই সুরটা কেটে যায়- চোখ দু’টি বন্ধ করে মনটাকে তুলার মত উড়িয়ে সুরটা ধরতে চায়- ধরতে গিয়েও ধরতে পারে না- ধরা দিয়েও ধরা দেয় না। কত দিনের কত কষ্টের পর- এক একটা সময়ের পর- এক একটা সিঁড়ির পর নুরুন্নাহার সেই জায়গাটা হারিয়ে ফেলেছে। কে কাকে হারিয়েছে? নুরুন্নাহার বুঝে পায় না। পুকুরের পানিতে ছোট ছোট ঢেউ দেখে তার মনের ভাবটা জমে ওঠে। ছেলে-মেয়েরهی লেখা পড়া করালে- বিয়ে করালে- তারা প্রত্যেকেই এখন সুখে আছে। পাঁচ ছেলেমেয়েই এখন ভিয়েনাতে- দেশে মাত্র একটা মেয়ে- ওটা শহরে। নুরুন্নাহার শহরেই থাকে। কিন্তু মাঝে মাঝে গ্রামে এসে পড়ে। কী একটা টান অনুভব করে এখানে আসতে। শহরে থাকলেও একটা অদৃশ্য ডোর তাকে যেন বেঁধে রাখে। আপন ভাইয়েরা আছে- দেবর-ভাসুর- তাদের সংসার—- প্রত্যেকেই ব্যস্ত। কিন্তু নুরুন্নাহারের কোন ব্যস্ততা নেই। বাড়ীটা খালি পড়ে আছে। একটা কামলা বাড়ীতে থাকে- বাড়ীটা দেখাশোনা করে- এই যা। ছেলেমেয়েদের কথা ভাবতেই নুরুন্নাহারের মনে হয় একটা তার কোলে, একটা কাঁধে, দুইটা দাঁড়িয়ে, একটা শাড়ী ধরে টানছে কোলে ওঠার জন্য- এমনও দিন গেছে। আজ চোখ মেলে দেখে তার মনে হয় সব শূন্য। গাছপালা আছে- বাতাস আছে- এই মাটি আছে- কিন্তু ছেলেমেয়েরা দূরে। তবে কি এই মাটিই সবচেয়ে কাছের? না, নুরুন্নাহার এই পথে যেতে চায় না। তার মনে একটা শূন্যতা বাস করে। মনে হয় সেই শূন্যতার মধ্যে খুব একা একা ঘুরপাক খাচ্ছে। খুব একা ঘুরপাক খাওয়ার মধ্যে কোন আনন্দ নেই। যখন স্বামী ছিল তখন সংসার নিয়ে- আয় নিয়ে- ব্যয় নিয়ে তারা একসঙ্গে ঘুরপাক খেতো। কিন্তু আজ নুরুন্নাহার খুব একা। ভিয়েনা কয়েকবার গিয়েছে- শহরেও যায়- ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনীদের আদর-যত্ন ভালোই লাগে। এক সময় গাছে ওঠে পা ঝুলিয়ে বসে থাকতে ভাল লাগততো- গাছ ঝাঁকিয়ে শরীর দুলাতে ভাল লাগতো। কিন্তু আজ গাছে উঠতেও নুরুন্নাহার ভয় পায়। কিন্তু মনেরে কিভাবে শিকল পরায়? কোথায় সেই শিকল? এই সংসার গড়তে কত কষ্ট করেছে নুরুন্নাহার! সারাটা জীবন কষ্ট করেছে। স্বামী চাকরির জন্য বাইরে বাইরেই রয়েছে- ছুটির দিন এসেছতো পরের দিনই দৌড়। কিন্তু সংসারটা সামলিয়েছে নুরুন্নাহার। স্বামী তাকে সোহাগ করে বলতো, ‘প্রিয়া আমার, নুরুন্নাহার’- কিন্তু এখন কেন যে তার মনে হয়-‘জীবন তোমার, নুরুন্নাহার’। শরীরের বাঁকে বাঁকে যত অনুভূতি, যত ঘ্রাণ, যত ব্যথা- তাই নিয়েই জীবন-মানুষের অস্তিত্ব। তবে নুরুন্নাহার আজ একা এই বিজনে কিষের অপেক্ষায় আছে? ঐ রনাক গাছটার পাশে শায়িত হওয়ার অপেক্ষা? নুরুন্নাহার ঠাস করে ভাবনার সেই দরজাটা বন্ধ করে দেয়। সে দেখে ভিতরে- একেবারে ভিতরে বুকের খুব গভীরে একটা লাল গোলাপ ফুটেছে। এটি মাঝে মাঝে দেখতে পায়। যখন একা বসে থাকে তখন সেই গোলাপটা সৌরভ ছড়ায়। নুরুন্নাহার ভাবে এই গোলাপতোতো বহু পুরানো গোলাপ- সেই যে ফুটেছিল- দেখতে ঠিক আগের মতোই আছে- মায়াবী-লাজুক। পাড় থেকে ঘরটির দিকে তাকিয়ে গোলাপের কথা কচু পাতার পানির মত পড়ে যায়। এই ঘরটি এক সময় কোলাহলে পূর্ণ থাকত। ছেলেমেয়েরা হৈ টৈ করতো- মোল্লা-মুন্সি ছিলো- হাঁস-মুরগি ছিলো- ছিলো, পুরা সংসার গোছানো ছিলো। না, এখন পুরাটা সংসার টাউস ঘুড্ডির মতো বাতাসে থাল যেমন বসে আছে। টাউস ঘুড্ডিতে বোঁ বোঁ আওয়াজ করে- কিন্তু নুরুন্নাহারের কোন আওয়াজের নিশানা পায় না- কোথায় একটা নীরবতা- একটা গভীর ভাব। এটাকে খুলতে পারে না। এর নামই কি জীবন? তাহলে জীবনের সফলতার দিকে তাকিয়ে নুরুন্নাহার কি সাগরে এসে পড়েছে? নদীর শেষ তো সাগরেই। না না, নুরুন্নাহার নিজেকে ওরকম ভাবতে পারে না। মনে হয় তার মনের মধ্যে বাঁশের একটা বড় সুন্দর করুণ ওঠেছে। ডাকাতিয়া নদী তার খুব চেনা- ওটাতে মেঘনায় পড়েই শেষ হয়ে যায় না- তারতো আরও অনেক পথ রয়েছে- কিন্তু নুরুন্নাহার সেই পথটুকু খুঁজে পায় না। তার মাঝে কি একটা অপূর্ণতা- টিউবওয়েলে কলসি পূরাতে গিয়ে কিছুটা যেন বাকি থেকে যায়- চাপ দিতে ইচ্ছে হয়- কিন্তু দেয় না- কলসির অপূর্ণ জায়গাটায় নুরুন্নাহার উপভোগ করে। কিন্তু কি বাকি রয়ে গেল? তখন হঠাৎ করেই দখিনা বাতাস এসে তার ঘোমটা সরিয়ে দেয়- সোনালী হারের সুন্দর গলাটা মেলে যায়। তাহলে কি এই বাতাসটাই বাকি? নাকি সেই লাল গোলাপটার সৌরভ শুঁকার? নুরুন্নাহার এত কিছু ভাবে না- শুধু একটা দুইটা কথা মনের মধ্যে ভিড় করে- ও হাঁটতে থাকে- জোহরের নামাজের আজান দিয়েছে- অজু করতে হবে।
Leave a Reply