রাসেরের মা চৌকির উপর কোনাকোনি ভাবে শুয়ে আছে, শরীর এলিয়ে দিয়েছে ক্লান্তিতে। কাপড় চোপড় একটু উদাসীন ভাবেই আছে। তার মনও উদাসীন ভাবেই ঘুরছে। ছেলেটা তাকে ইদানিং সহ্যই করতে পারছে না। ছেলেকেি বা দোষ দেয় কিভাবে এটুকু ছেলে বয়স সবে বারো, সে এই দুনিয়া সংসারের কি বোঝে। তার কাছে এই সব ব্যাপার মন মত ঠেকে কি করে। ছেলের কাছে যে তিনি বিষ হয়ে যাবেন তা আগেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন কিন্তু তার কোন উপায় ছিল না এই কলিসমাজে ইজ্জত নিয়ে থাকতে। ছেলেটা মন মরা হয়ে থাকে কেবল, ঘরে এলে তো কথাই বলে না, কিছু জিজ্ঞাসা করলে ‘হ’ ‘না’ বলেই কথা শেষ করে। বেশি কিছু বল্লে তো ক্ষেপে ই যায়। বয়স তার বারো কিন্তু ছেলের ভাব সাব যেন বাহাত্তুরে-র ছেলেটা তার নাড়িকাটা ধন,ছেলের চেহারায় এখনও একটা মাসুম ভাব আছে যা দেখলে বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে। মুখে ছেলে কথা বলে না কিন্তু চেহারা তার বলে দেয় এই দিন দুনিয়ার উপর সে নাখোশ।
ছেলেটার জন্য রাহেলার হৃদয়ে কোথাও গভীর কাঁটা ক্ষতের মত দগদগে ব্যথা করে, চাপ দিলেই তা ভগভগিয়ে ছড়িয়ে পড়ে শরীরে আর শরীর কেঁপে ওঠে, আর কাঁপা শরীর যেন আবার আবার কাঁপতে চায়, ওই শিহরণটা যে একটা সুখ, নাড়ি কাঁটা ধনের সুখ। কিন্তু সুখটা বারবার পেতে একটা প্রবল কষ্ট হয় দেছে কেননা ক্ষত থেকে কটু গন্ধের একটা ঘন তরল বের হয় যা চোখে দেখতে ইচ্ছা করে না, নাকে স্বাদ নিতে চায় না কেননা এই গন্ধ পেটে প্রবেশ করে,পেটে শুধু ডুমডুম করে বমি করার জন্যে তখন মনটা উতলা করে কিন্তু বমি করলেই যে সব উগরে বের হয়ে যাবে, নাড়িভুড়িও বের হবার জন্যে কুহুকাহা করবে। তাই বলে সে ছেলেকে বোঝানোর চেষ্টা কম করে নাই, তার জন্যে ছেলেকে সে খাইয়েছে দাইয়েছে আর তার নিজের জমে থাকা টাকার প্রায় সবই দিয়েছে যাতে ছেলে খুশি থাকে, টাকা ছেলেকে দেওয়ার সময় ছোট আব্বার নাম করে করেই দিয়েছে যাতে ছেলের মন গলে। টাকা-পয়সা খাবার-দাবার ছেলে এমন ভাবে নিয়েছে, যাতে মনে হয় এটা তো রোজকার ঘটনা। তখন তার মনে হয়েছিলো ছেলে কিছুই করবে না, ব্যাপারটা স্বাভাবিক ভাবে নেবে কিন্তু ঘটনার পর ছেলে কিছু বলত নাই কিন্তু সে যে দিন দুনিয়ার উপর নাখোশ তা তার চেহারা দেখলেই দিনের মত সাফ ছিলো। রাহেলার আর কি’ই বা করার আছে। প্রথম প্রথম খুব তোষামদ করত ছেলেকে, ছেলে কোন কথা বলত না, এখন তো খেপেই যায় তাই বিশেষ একটা কিছু বলাও হয় না। আজ দুপুরে ভাতের সময়টা কিভাবেই না তাকাল তার দিকে, প্রথম কথাটার কোন জবাব দিল না, শুনছে কি শুনে নাই তাই বোঝা গেল না, দ্বিতীয় সময় এমন চোখে তাকাল যে রাহেলাকেই চোখ ফিরিয়ে নিতে হলো, নয়তো ছেলে দুইটা কথা না বলে ওঠে আবার। এর পর আর কথা হয় নাই, ছেলে চুপচাপ খেয়ে ওঠে যাবার পর প্লেটটা ধুয়ে রাহেলা বিছানায় শরীর এলিয়ে দেয়, শোয়ার আগে ঘরের টেবিল ফ্যান তার দিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
আব্দুল হাকিম বেড়ার দরজা সরিয়ে দেখে রাহেলা চিৎ হয়ে বিছানায় শুয়ে আছে। তার শাড়ির কাপড় হাঁটুর নিচে পড়ে আছে, পেটের উপর শাড়িটা চিকন ভাবে ভাজ হয়ে আছে আর আঁচলটা বুকের ঠিক নিচে দিয়ে বিছানায় পড়েছে। বুকটা ঠিক ছাদের দিকে মুখ করে ওঠা নামা করছে পেটের তালে। আব্দুল হাকিম আজ খেয়েই এসেছে, এক ছেলের বাবা ওসি সাহেবকে খুব ধরা ধরি করছে তার ছেলেকে ছেড়ে দেবার জন্য কিন্তু ওসি সাহেব দশের নিচে নামতেই চাচ্ছে না। শেষে আব্দুল হাকিমকে ধরে, ওসির মন গলাতে তার পক্ষে পাঁচের বেশি দেয়া সম্ভব না। তাকে দিয়েই আজ একটা জবরদস্ত খাওয়া হয়ে গেল, আব্দুল হাকিম সুযোগ পেলে ছাড়ে না, খাসি মুরগি সবই চলে এক যোগে। আসার সময় আবার তিনশ নিয়েও এল। এরকম ভুরি ভোজের পর আর ওখানে যেতে মন চাইল না হাকিমের। ভাবল একটু ঘরেই শুয়ে বসে আসা যাক। খোশ মেজাজে একটা কড়া বাবা আর খয়ের দিয়ে পান মুখে দিয়ে সাইকেলে চড়ে তার ঝুপড়িতে চলে এল।
বেড়ার দরজা খোলার আওয়াজে রাহেলা সামান্য চমকিয়ে চোখ খোলে। শরীরটা এলিয়ে দিয়ে ফ্যানের বাতাসে তার দুচোখ ধীরে ধীরে লেগে আসে। আব্দুল হাকিম মানে তার স্বামী, দ্বিতীয় স্বামী ঘরে উপস্থিত। চোখের দৃষ্টি দাউদাউ করছে, চেহারায় লকলকে কোন শিকারীর হিংস্রতা। রাহেলা উঠে বসতে যাবে তো আব্দুল হাকিমের হুংকার, ‘তোর ওঠন লাগবো না, আমি আইতাছি, বেড়ার দরজা বন্ধ করে আব্দুল হাকিম এগিয়ে খাটে বসে তার এক হাত হাঁটুর কাছে কাপড়ের নিচে চলে গেল আর সেটা তার চরাচরের অঞ্চল বাড়াতে লাগলো, অন্য হাত অশান্ত ভাবে ঊর্ধ্ব অঙ্গে কাজ চালালো, আব্দুল হাকিমের মাথা রাহেলার ঊর্ধ্ব অঙ্গে নেমে এলে, রাহেলা বালিশে মাথা একপাশ করে আবেশে চোখ বুজে নিলো আর শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে থাকলো মুখ দিয়ে।
আব্দুল হাকিমের চাকরী সেন্ট্রি, তাই বলে সে হত দরিদ্র পুলিশ ভাবা ভুল হবে। তার বেতনের চেয়ে কমিশন প্রতি মাসে তিন গুণ। আর আজকের মত এই রকম ফকরা ইনকাম তো প্রায়ই হয়। সেটা দিয়েই তার শহরের খরচ চলে যায়। গ্রামে সপ্তাহে গেলে এক আধদিন থাকে, খরচ-টরম যা একটু হয় তা গ্রামেই। সেখানে তার পরিবার বড়ই ধরা চলে, সন্তানাদি আছে পাঁচ জন। এদের এক জনের বিয়ে হয়েছ বছর তিনেক হল, তার সন্তান হয় না বলে তাকে পোহাতে হচ্ছে একটা আলগা ঝামেলা, জামাই ড্রাইভার ইনকাম ভালোই তবুও তার কাছে প্রায়ই ধারদেনার নাম করে পয়সা কড়ি নিয়ে যায়, হাকিম তাকে না চাইলেও দিতে বাধ্য হয় জামাই এমন ইনিয়ে বিনিয়ে কথা বলে যে তার রাগ ধরে যায় আর কথার মাঝে কেবল এক্সট্রা ইনকামের ঝাড়ি পড়ে শালা ইনকাম করি আমি আর তোকে দিতে হবে কিনা তার ভাগ। জামাইয়ের চেহারা দেখলেই হাকিমের গা জ্বলে যায়, তবুও কিছু বলতে পারে না, জামাই বলে কথা!
বড় মেয়ের পরই পর পর তিনটে ছেলে শেষে আবার মেয়ে দিয়েই বংশের ধারা বন্ধ করে হাকিম। বড় ছেলে সবে ক্লাস নাইনে, মেট্রিকটা পাশ করতে পারলে তাকেও ঢুকিয়ে দেবে এই চাকরিতে। বড় সাহেবদের সে কম তোষামদ করে না, তারা বুঝি এইটুকু করবে না। বাকি ছেলে দুটো সেভেন সিজে, তাদের নিয়ে এখনো কিছু ভাবেনি হাকিম, বয়স আরও বাড়ুক মতি গতি দেখে ঠিক করা যাবে এদের ঠিকানা ছোট মেয়েটা একটু ডাংগর হোক, তারপর ভালো একটা পাত্রে দিয়ে দিবেনি যাতে পেটে ভাতে থাকতে পারে, দুধে ভাতে থাকার মত রূপ এ মাইয়ার নাই। তবে পাত্র এবার যাইহোক ড্রাইভার হওয়া চলে না, সেটা হাকিম ভালোই বুঝেছে।
ছেলে যে আরেকটা আছে সেটা হাকিম ভুলেই গেছে, রাহেলার ছেলে রাসেল, রাহেলা তার শহরের স্ত্রী। শহরে হাকিম সারা মাস থাকে, তাতে তার খাওয়া দাওয়া, থাকা নিয়ে একটা সমস্যা হয়। তাই এই রাহেলাকে বিয়ে। রাহেলাকে হাকিম একবার দেখেই পছন্দ করে নেয়, গায়ের রং শ্যামলা, আরেকটু ময়লা হলে কালোই বলা যেতো। হাকিম কি আর দুধে আলতা রং চায, মোটামোটি চললেই তার চলে। তবে মাগী মাল আছে, একদম যেন টসটসে, হাকিমের চোখ এখানে জহুরীর, আসল মাল চিনতে তার ভুল একদমই হয় নাই। ছেলে একটা আছে এটা আগেই জানতো, তবুও হাকিম রাজি ছিলো। তার জন্য তো আর কুমারী বসে থাকবে না, তার বয়সতো কম হলো না। রাহেলারও একটা সহায় দরকার, তারও স্ত্রী দরকার। রাহেলার আগের স্বামী বোধ হয় রিকশা ড্রাইভার ছিলো, ছেলে হবার দুই বছরের মাথায় শালা ভাগলো রাহেলা তখন থেকেই অন্যের বাসায় বান্দীগিরি করে সংসার চালায়। পেট রাহেলার ঠিকই চলে যায়, কিন্তু তার শরীর ঠিকরে যেন ক্ষুধা বের হয়, আর পেটুকের তো অভাব এই দেশে নেই, রাহেলা তাই জুতসই একটা নাগর চাচ্ছিলো। এর মাঝেই অনেকবার খাদ্য হতে হয় তাকে। তবে রাহেলার এভাবে একেবারেই ভালো লাগতো না, কিন্তু তার ঠেকাবার কোন ক্ষমতাই ছিল না। সহ্য করতে হত অনেক কিছুই, শেষ-মেষ আব্দুল হাকিমের সাথে বিয়ে হয়ে গেল, তার দিকে এখন চোখও দেয় না কেহ ঠিক মত কেননা সবাই জানে তার নতুন নাগর একদম পুলিশই।
রাহেলা বিছানা ছেড়ে ওঠে কাপড় ঠিক করতে করতে আব্দুল হাকিমকে বলে ‘আসেন খাওয়া লন।’
আব্দুল হাকিম চিৎ হয়ে শুয়ে রাহেলার কাপড় পরা দেখতে দেখতে বললো ‘খাযা আসছি, তুমি খাওয়া লও, ডিউটিতে যাইতে হইবো আবার।’
বাম পাশে ফিরে হাকিম চোখ বন্ধ করে। রাহেলা একটু সময় নিয়ে গোসল খানা থেকে বেরোয়, হাত মুখ মুছে, নিজেই খাবার আয়োজন শুরু করে। এবেলা রাহেলার কোন কাজকর্ম থাকে না, তাই শুয়ে বসে কাটায়। মাঝে মাঝে কেহ যেতে বললে, ফাইফরমাইস খেটে দেয়, তার বিনিময়ে যে কিছু পায় না তা না। হাকিম যাবার পর রাহেলা শুয়ে আছে, যে সুখের সন্ধানে সে জীবনময় শুধু কষ্ট করে গেল, তা কি সে পেয়েছে, এটা ভাবতে গিয়ে রাহেলার চোখ ঝাপসা হয়ে গেলো, চোখ তার পানিতে ভরে গেলো। এই যে কষ্ট সে সহ্য করে এগিয়ে যাচ্ছে, তা কার জনো, নিজের জন্য, না ছেলের জন্য? নিজের জন্য সে আর কি করবে তার দিন তো এখানেই শেষ। তবুও তাকে পাড়ি দিতে হবে অনেক পথ এই জীবনের শেষ দেখার জন্য। ছেলের জন্যই বা সে কি করতে পারে, তার কি কিছু করার ক্ষমতা আছে, যে সে কিছু করতে পারে। তার শুধু কষ্ট করটাই সার। এই কষ্টও তার নিজের জন্য নয়, কখনো হয়ত হাকিমের জন্য কখনো রাসেলের জন্য কিংবা অন্য কারো জন্য, কিন্তু তার জনো তো নয়ই। ছেলেটার জন্য তার শুধু মায়া। কষ্ট শুধু নিজের জন্য, ছেলের ভাব এলেই বুকমোচড় দেয় ব্যথায়, বুক টনটন করে। রাহেলার আর কিছুই ভালো লাগে না। পাশ ফিরে শোয় রাহেলা।
রাহেলা জীবনে কিছুই খুঁজে নি, সে শুধু হয়তো বেঁচে থাকতে চেয়েছিলো, ভালো ভাবে বাঁচতে চেয়েছিলো, দুমুঠো ভালো খাবার, একটা পরনের কাপড় আর মাথাগোজার ঠাঁই। কিন্তু তার কপালে কিছু জুটেনি যাতে সে খুশি হয়ে পারে।
তার মা মানুষের ঘরে বান্দীগিরি করত, বাপের চেহারা তার মনে নাই, বেঁচে আছে কি নাই তাই জানা নাই, তার জন্মের পর পরই তার বাপ ভেগেছে, হয়তো এখন অন্য কোথাও বিয়ে করে সংসার পেতেছে, এই বউকেও হয়তো একদিন ছেড়ে চলে যাবে, এখানেও হয়তো দুই তিন বাচ্চা পয়দা করবে। তারপর নতুন জায়গায় নতুন সাদী করে আবার সংসার পাতবে। বেটার জাতই বেইমান, তারা শুধু পারে মাগী খেতে।
মা তাকে কি খেতে দিবে, পরতে দিবে নিজেরই কিছু জুটত না। পঁচা বাসী খাবার আর ছেড়া ফাড়া কাপড় পরেই তাকে চলতে হত। মাঝে মাঝে গরম ভাত জুটত তবে তরকারী এই কুড়িয়ে আনা সবজি থেকে বেশী কিছু নয়। রাহেলার স্বপ্নে তাই ভালো কাপড় আর খাবারই ঘুরে বেড়ায়। তার বিয়ে দেয় ষোলতে থাকতে এক রিকশা ড্রাইভারের সাথে প্রথম দুবছর ভালোই কেটে গেলো, রিকশার আয় রোজগার খারাপ নয়, দিনরাত ভালোই কেটে যেত রাহেলা। ধীরে ধীরে লুতফুরের মেজাজ তিরিক্ষি হতে শুরু করে, তখন নেশা ভাংও শুরু করে লুতফুর। এর মাঝেই রাসেলের জন্ম হল। ছেলের দ্বিতীয় বছর হওয়ার আগে আগে লুতফুরের আর খবর নেই। বাড়ি ঘরে আসে না, সাথ্যের ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করলেও বলতে পারে না, কেহ কেহ বলে ঢাকা গেছে, আর ফিরে আসবে না। তারা যে সত্যি কথাই বলত রাহেলা তা ধীরে ধীরে বুঝতে পারে। এক সময় সে সত্যটা উপলব্ধি করে, লুতফুরের আশা ছেড়ে দেয়।
প্রথম প্রথম একটু কষ্ট হত পরে কাজকর্ম পাওয়ার পর বেশী কষ্ট করতে হয় নাই। সে আর রাসেলই তো, এভাবে দিন কেটে যেতো। দিন কেটে কেটে সময়ও বদলে যেতে শুরু করে, মানুষের মন মানুষের চেহারা সব বদলে যেতে থাকে। যে সব বাসায় কাজ শুরু করে, তাদের দৃষ্টি ধীরে ধীরে রাহেলা কাজ থেকে রাহেলার ওপর এসে পড়ে মানে রাহেলার শরীরে। তাদের বৌদের শরীর তার থেকে অনেক হৃষ্টপুষ্ট হলেও তাদের চোখ রাহেলার আপাত অপুস্ট শরীরে পড়ে। তাদের অল্পেই রাহেলার অপুস্ট শরীর পুষ্ট হতে হতে কুড়িতে এসে যায়। তখনই রাহেলার পুষ্ট শরীরে অল্পের দাম মিটানো হল। এ গৃহ স্বামীরা সবাই আজান দিলেই জায়নামাজ হাতে বেরিয়ে পড়তো আর স্ত্রীসন্তানের কর্তব্যে ব্যস্ত থাকত। তখন রাহেলার লুতফুরের কথা মনে হত আর ভাবত লুতফুর এদের থেকে অনেক উন্নত, তার কোন মুখোশ ছিল না, ছিল না কোন ভন্ডামী। এদের ছেলেরা যাদের মাত্র দাড়ি মোছ গজানো শুরু হয়েছে এরাও গোগ্রাসে রাহেলাকে গিলত। প্রথম প্রথম বেটা বলে এটা বলে এটালে গাল পাড়তো নিজে, পরে এটা তার কাছে কোন বিষয় হিসেবে ধরা দিলো না।
তাও রাহেলা টিকে ছিলো, কেননা এরা ভদ্রতার মুখোশ পরে কাজ করত। পরে তার ঝুপড়ির আশপাশের পুরুষগুলো তাকে আবিষ্কার করতে শুরু করল। তারা নতুন আবিষ্কারকে যতটা পারে ব্যবহার শুরু করল। প্রথম প্রথম জোর জবরদস্তি করত পরে ব্যবহার কারীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়াতে তাকে টাকা পয়সা সাধতে শুরু করে। রাহেলা ভয় পেয়ে যায়, তীব্র ভয়, তখনই বুড়ির-মার মাধ্যমে আব্দুল হাকিমের সাথে রাহেলার বিয়ে হল। রাহেলা সেই ভয় থেকে বাঁচতে, নিরপত্তার জন্যে হাকিমের সাথে আবার বিয়ে বসে। বেটা জাতের উপর যদিও তার বিশ্বাস নাই, তবুও তাকে এখান থেকে বেটা জাতই পারে রক্ষা করতে তা না হলে রাহেলা পাড়া বদল করে পয়সা নেওয়া পাড়ায় চলে যেতো বলে ঠিক করে রেখেছিল।
আব্দুল হাকিমের ব্যাপারে সবই জানত রাহেলা, তবুও রাজি ছিলো কেননা হাকিম তাকে বিবাহে রাজি ছিলো। হাকিমের গ্রামে যে, একটা সংসার আছে এবং সেখানে পাঁচ ছেলেমেয়ে তাও জানত। রাহেলার আগে হাকিমের শহরে যে বউ ছিল তা চেপে যায়। কিন্তু রাহেলা তা বুড়ির-মা থেকে জানতে পারে, সে ঘরে অবশ্য কোন সন্তান নেই। হাকিমের সেই বউয়ের সাথে বনিবনা না হওয়ায় সে তাকে তালাক দেয়। হাকিম পরে তা স্বীকার করে। রাহেলা তাকে(হাকিমের আগের বউ) একবার দেখেছিল, চেহারা বলতে কিছু ছিল না মহিলার, শরীরেও শুধু হাড্ডি আর তার উপর চামড়া। হাকিমের কি করে বনিবনা হয়! হাকিম কি বজ্জাতিতে কম যায়, শহরে যাতে খরচ না বাড়ে, তাই মাছের তেল দিয়ে মাছ ভাজায় ব্যবস্থা করে। বিয়ের আগেই কথা রাখে, সে রাহেলা রাসেলের পনের দিনের খাবার দিবে, বাকি মাস রাহেলা। ঝুপড়ি ভাড়া অবশ্য হাকিমই দেয়। আর প্রয়োজন মত রাহেলা কাপড়, রাসেলের কোন কিছুই তার নয়, তবে সে থাকতে পারবে।
রাহেলা সবই মেনে নেয়, তার নিজের দিকে চেয়ে নয়তো ছেলের দিকে চেয়ে, ছেলেও যদি এখন তার দিকে না চায় তো রাহেলা কই যায়।
রাহেলা ডুকরে ওঠে একটু, তার চোখে কোন পানি নেই, কিন্তু বুকে জমাট পাথর, পাথর জমে জমে তার গলাও বন্ধ করে দেয়। হঠাৎ তার মায়ের মুখ মনে পড়ে, তাই বুকের পাথর কয়েকগুণ বেড়ে যায়, পাথর তাই তার গলা বন্ধ করে ফেলতে চাইলে শ্বাস নিতে রাহেলার কষ্ট হয়, জোরে দম নিতে নিতে ওঠে গিয়ে পানি খায়, এক গ্লাস, দু গ্লাস, তিন গ্লাসের অর্ধেক খেয়ে শেষ করলে পাথর একটু গলে নিচে নামে রাহেলার গলা আবার খুলে গেলে সে আস্তে ধীরে শ্বাস নিতে নিতে বাকী পানি শেষ করে।
আব্দুল হাকিমের কেমন অস্থির অস্থির লাগছে, কোন কিছুতেই মন বসছে না, ডিউটি আর কি বসে থাকা দাঁড়িয়ে থাকা। ভাব কাটানোর জন্যে ভাবল একটু রাহেলার সাথে কাটিয়ে আসা যাক। এই সময়ই তো রাহেলা ঘরে আসে। স্যারকে বলে হাকিম ঝুপড়ির দিকে রওনা হয়। রাহেলা এখনও আসে নাই, তার ছেলে এসেছে, বিছানায় শুয়ে আছে। হাকিমের আসা সে টের পায় নাই। হাকিমের একটু লোভ হল, এখনও কচি, মাত্র বারো। রাহেলাকে তো দিন দিন হয়ই, একটু স্বাদ বদলানো যাক এই ভেবে হাকিম রাসেলের বিছানার দিকে অগ্রসর হয়।
কাজ থেকে ফিরে রাহেলা দেখে দরজায় তালা নাই, সে ভাবলো রাসেল এসেছে হয়তো, তার শরীর বিশেষ ভালো নেই, সকালে যাওয়ার সময় একটু গা গরম গরম মনে হয়েছে। তাছাড়া হাকিম আরো পরে ফিরে। বেড়ার দরজা ঠেলা দিয়ে রাহেলা ভিতরে ঢুকে, দরজা তার হাতে ধরা, চোখ বিছানায় গিয়ে পড়ে, প্রথম কয়েক মুহূর্ত রাহেলা ব্যাপারটা বুঝতে পারেনি হয়তো তার জন্য সূর্যের আলো দায়ী নয়তো ব্যাপারটা কি তা রাহেলার মাথা বুঝতে একটু বেশি সময় নেয়। রাসেল বিছানায় উপুড় হয়ে হাকিম তার উপর হামাগুড়ি দেওয়ার ভঙ্গিতে। রাহেলা মুহূর্ত কাল ব্যয় করে বেড়ার ফাঁক থেকে একটা ধারালো ব্লেড বের করে হাকিমের দিকে এগিয়ে যায়।
একটা পুরুষের অতি তীব্র চিৎকারের পরেই জানা যায় যে, এটি রাহেলার একটি অতি গোপন শখ ছিলো।
Leave a Reply