এক
‘আপনি কোন চিন্তা করবেন না। কাজের পরে টাকা দিবেন। আপনাকে তো আগে টাকা দিতে বলছি না।’ কালো রঙের ছেলেটি এভাবেই কথা বলে এবং তার কথাগুলোর গায়ে আন্তরিকতাহীন ব্যবসাবৃত্তির গন্ধ পাওয়া যায়। প্রণব তাকে পছন্দ করে না কিন্তু তার কাছে না এসেও উপায় নেই। প্রণব তার সাথে কথা বলার সময় অন্যমনস্ক থাকে। ওর ধূর্ত কথাগুলো বুঝতে পেরেও সে প্রয়োজন মাফিক প্রতিবাদ করতে পারে না। প্রণবের স্থলে যদি জনি হতো, তাহলে এই ছেলেটি তাকে (জনিকে) ভয় পেতে বাধ্য হতো। জনি ধূর্ত কথার ধূর্ত প্রতি কথা বলতে জানে কেননা সে এইসব অবৈধ লোকগুলোর দুর্বলতা জানে এবং সেই দুর্বলতায় টর্চ ফেলে সে অভ্যস্ত।
অর্থহীনভাবে কপালের চুলগুলি উপরে উঠিয়ে কালো ছেলেটি ক্ষণিক পরেই বললো ‘কিছু টাকা এখনই না দিলে কিভাবে হয়। ঐ লোকেরে তো আগে কিছু দিতে হবে। আমি আপনার সমস্যাটা বুঝি, ঐ লোক বুঝত না। টেকা দিলে উনি কাজ করবেন। বুঝেনই তো?’
কি বুঝে প্রণব? প্রণব কিছুই বুঝে না এ সম্বন্ধে। তবে কালো ছেলেটি যে কথার ইন্দ্রজালে তার চিন্তা শক্তি রোধ করে ফেলেছে, একখা খুব বুঝতে পারছে। এই মুহূর্তে ওর গালে কষে একটা চড় দিয়ে যদি বলা যেত ‘ক্ষণিকের মইধ্যে কথা পাল্টাওকা মিঞা। বেআইনি ব্যবসা কইরা খাও। টেক্স দেও না কাউরে। টাকা এত নগদ নগদ চাও কিল্লিগা?’ তাহলে কেমন হতো? উচিত জবাব হতো। কিন্তু প্রণব এমনভাবে কথা বলতে পারে না। তার কথাগুলো তরল এবং বিনয় মিশ্রিত। এই মুহূর্তে সে চুপ করে আছে এবং তার হৃৎপিণ্ড উঠা নামা করছে এবং মাথা + বুকের চামড়ায় কাঁচের গুড়ার মতো ধারালো উত্তাপ অনুভূত হচ্ছে। সে বললো ‘দেখেন কাজের আগে টাকা—- আমারেও তো ম্যানেজ করতে হবে।’
‘তা করবেন না! কাজ করাবেন, টাকা ম্যানেজ করতে হবে না। শুনেন আমরার কথার দাম আছে। আমরা যেটা পারি বলে দৃঢ় বিশ্বাস, সেই কাজের জন্যই অগ্রিম টাকা নেই।’ কালো ছেলেটি অস্তগামী সূর্যের মতো অস্থির বর্ণের হাসি হেসে কথাগুলো বললো। প্রণব ওর দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলো এই কম বয়েসী বেশী পাকনা ছেলেটার হাস্য প্রচেষ্টা কতটা বিশ্রী! সে ইচ্ছে করলে ভদ্রভাবেই বলতে পারতো ‘প্লীজ হাসবেন না, হাসলে আপনাকে বিশ্রী লাগে।’ এই কথাটুকু বললেও হতো। এই চতুর ছেলেটি ভয় পেত প্রণবকে। কারণ চালাক মানুষ বুদ্ধিমান লোককে ভয় পায়। প্রণব বুদ্ধিহীন নয় তবে প্রয়োগহীন। ওর রক্তের এই জড়তারই সুযোগ নিচ্ছে কালো ছেলেটি। অবশেষে সে পরবর্তী কত তারিখে আসবে এবং কত টাকা জোগাড় করে রাখতে হবে, তা বুঝিয়ে দিয়ে চলে গেল। যাওয়ার আগে একটা নষ্ট তৃপ্তির ভাব ওর মুখে ফুটে উঠল, পরের দুই দিন প্রণব এই আশংকায় সময় কাটাল, যে দ্বিতীয়বার তাকে ঐ ধরনের তৃপ্তির সম্মুখে দাঁড়াতে হতে পারে। প্রণব মানুষের খুশিতে আনন্দ পায়, কিন্তু এরকম অন্যায় খুশি তাকে অসুস্থ করে ফেলল। সে চায় না, তারপরও আরেকজন তার থেকে অন্যায়ভাবে সুবিধা নিয়ে নিবে, সে কোন প্রতিবাদ করতে পারবে না; একথা ভাবতেই তার ভিতরে হিংস্রতা জন্ম নেয়। সে কল্পনায় নিজেকে অনেক সাহসী ভূমিকায় দেখে, মারপিট করার কথা ভাবে এবং এক পর্যায়ে সে এই ভেবে সান্ত্বনা পায় যে, সমান দোষে সে নিজেও দোষী। নকল মার্কশীট যে বানায় এবং যার জন্য বানানো হয়, তারা উভয়ে অপরাধী। কিন্তু তার মনে হয় সত্যি সত্যি তার কোন দোষ নেই।
সে যদি তার পরিবারের প্রতিটা সদস্যকে ভয় না পেত, তাহলে ফলাফল ঘোষণার দিন বাসায় এসে মিথ্যা কথাটা সে হয়তো বলতো না। তারপরও হয়তো সে এই কুপথ দিয়ে নামতো না, যদি না তার বন্ধু জনি নকল মার্কশীট বের করাকে তার বাম হাতের কাজ বলে দাবি না করতো। জনি বলে ‘ভাত ছিঁটলে কাউয়ার অভাব হয় না। টাকা থাকলে, এমন কাজ নাই যা হয় না।’ প্রণব তার কথায় সম্পূর্ণ আস্থা রাখতে পারে নি ‘এসব কাজে টাকা যায়, কাজের কাজ কিছু হয় না।’
‘কে কইছে? তুই টাকা দে এক সপ্তাহের মধ্যে তুই তোর মার্কশীট হাতে পাইবি।’
‘সপ্তাহ টপ্তাহ বুঝি না, পনের দিনের বিতরে যেমনেই হোক তুই আমারে মার্কশীট তুইলা দিবি। তোমার বাহাদুরী কথা তোমার কাছেই থাক। আমি মার্কশীট চাই।’
‘এখন দেখি উচিত কথা বের হয় ঐ লোকের সামনে যে বিলাই হইয়া থাকছ!’
প্রণব আর কথা বলে না, সে জানে কথাটা সত্যি। সেই ছেলেটির সামনে আসলেই প্রণব কচ্ছপের মতো গুটিয়ে যায়। তাই আজ সাহস দেখিয়ে, ভয়কে ভয় না করে সে একা গিয়েছিল ছেলেটার সাথে দেখা করতে। ছেলেটা তাকে একা পেয়ে অগ্রিম টাকার অঙ্ক মোট প্রদেয় টাকার অর্ধেকেরও বেশীতে নিয়ে গিয়েছিল। প্রণব ফাইনাল কথা দেওয়ার আগে বলেছিল ‘আচ্ছা, আজকে টাকার জোগাড় করে, কালকে ফাইনাল কথা হোক?’
’আবার কালকের জন্য রেখে দিবেন নাকি। আমার সুযোগ সুবিধা আছে না। বোর্ডের লোককে কাল টাকা দেওয়ার কথা। আজকে তারে ফাইনাল করতে হবে। আমিতো আপনার একার কাজ করছি না। ১৫/২০ জনের মার্কশীট আমাকে তুলতে হবে। এখন আপনারা যদি টাকার ব্যাপারটা ক্লিয়ার না করেন, তাহলে কিভাবে হয়, কন তো?’
প্রণব তো এত কথা শুনতে চায় না। সে শুধু জনির সাথে পরামর্শ করার জন্য একটা দিন সময় চেয়েছিল, যেহেতু মিথ্যা বীরত্বের মোহে পড়ে সে জনিকে আজকে সঙ্গে আনেনি; অথচ লোকটা এই মুহূর্তে ফাইনাল কথা জানতে চায়। কেমন সুযোগবাদী নষ্ট লোক, ছি! প্রণব তার চেহারায় ঘৃণা আনার চেষ্টা করে, কণ্ঠে অবজ্ঞা মিশ্রিত আত্মবিশ্বাস ফুটাতে চায় কিন্তু কালো লোকটার উৎসুক লোভের কাছে পরাজিত হয়ে তার কল্পিত প্রতিজ্ঞা ধোঁয়ার মতো অদৃশ্য হয়ে যায়। তখন সে তার ক্রেতা পক্ষীয় ভান ভেঙ্গে দিয়ে, অসহায় মানুষের মতো বলে ‘সত্যি সত্যি আমারটা বানাতে পারবেন তো। পরে দিয়া সমস্যা হবে না তো।’
নিজের অসহায়তার কথা বলে করুণা চাইতে অভ্যস্ত নয়, তাই সে এর অধিক কিছু বলতে পারে না। তবুও কালো লোকটার মন কিছুটা নরম হয় অথবা এ সময় নরম হওয়ার ভান করতে হয় বলেই হয়তো লোকটা এতদিনের আলাপে প্রথম বারের মতো আন্তরিক স্বরে বলে ‘আপনি নিশ্চিত থাকেন’ কেবল এইটুকুই, আবার সে তার পরিচিত স্বর ও ভাষায় বলে ‘আমরা সিউর না হয়ে কোন কাজে হাত দেই না। টাকা পাইলে কাজ করি, নাইলে করি না। কিন্তু মক্কেলের সাথে গাদ্দারি করি না।’
শেষের কথাগুলি কানে না তুলে প্রথম কথাটায় প্রণব আশ্বস্ত হলো এবং লেনদেনের হিসাব চূড়ান্ত করে আসলো। পরে জনির কাছে জানতে পারলো সে নির্বুদ্ধিতার কাজ করেছে।
দুই
‘কি গো মা, আমনে মাডে গিয়া রইদ পোয়াইলেই তো আলাদা কইরা আরেকজনরে পাডান লাগে না। দেহেন না পোলাপাইনডি কতা শোনে না।’
প্রণবের ঠাকুমা, বৌমার কথা শুনে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায় এবং জুতা পা দিয়ে ততোধিক ধীরে মাঠের উদ্দেশ্যে পা বাড়ান এবং তার এই ধীর আচরণে অনুচ্চারিত অনিচ্ছা খুব প্রকটভাবে প্রকাশ পায় বলে প্রণবের মা বিরক্তি পীড়িত কপাল এবং চোখ নিয়ে প্রণবের ঠাকুমার দিকে তাকিয়ে থাকে।
যেতে যেতে নিজের সাথে কথা বলছেন এমন স্বরে তিনি বলেন ‘এক কেবল আমিই আছি পিছামারা কামের লিগা।’ বুঝা গেল বৌমার বিরূপ চাহনি তিনি অনুভব করেছেন।
‘আমনের যাওন লাগত না। আমনে উডানে বইয়া রইদ পোয়ান। আমি বান্দি আছি না, ঘরের কাম, বাইরের কাম করনের লিগা। একটা মাইনসেরে একটা কামের কতা কওন যায় না। কেউ পারত না। আর যদি করতে হয় মুখটারে ছালির মতো কইরা করে, যেন এডি আরেক বাড়ীর কাম। হেরা যেন সব এ বাড়ীর মেমান।’
যেই আশঙ্কা করেছিলেন প্রণবের ঠাকুমা, তা এত নীরবতা এবং সাবধানতা অবলম্বনের পরেও এড়াতে পারলেন না। তাই ঝগড়া করার ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও যেতে যেতে বলে গেলেন ‘তোমার সময় বৌ, চিল্লাও। পাড়া না জমাইলে হয় কেমনে?’ তিনি চলে গেলেন।
‘ভদ্র সাজন! খাটের উপর উইঠা বইয়া থাকলে কোন ভেজাল ছোঁয় না। যায় তো সব আমার উপর দিয়া। চিল্লাইত না? ইজাত ভদ্দরলোেকির দরকার নাই আমার।’
কথাগুলো সহ্য করার মতো অন্য কোন ব্যক্তি উপস্থিত নেই বিধায় প্রণবের মা চুপ করলেন এবং লাউ কাটার গতি আরো বাড়িয়ে দিলেন। কপালে এখনো তিক্ততার রেখা সুস্পষ্ট আছে।
‘প্রণব, এই প্রণব এদিকে আয় তো, এট্টু ধর।’ প্রণবের কাকা রিক্সা থেকে নেমেই প্রণবকে ডাকলেন। রিক্সার পা দানিতে রাখা সিমেন্টের বস্তাগুলো ধরে ঘরের ভিতরে নেওয়ার জন্যই এই ডাক। কিন্তু প্রণব এলো না। রিক্সার ড্রাইভার আর প্রণবের কাকা বস্তা গুলো ভিতরে রাখলেন। ড্রাইভারকে ভাড়া পরিশোধ করে ঘরে বৌদিকে শুনিয়ে তিনি বললেন ‘লাট-বেলাটের বাইচ্চাডিরে কতা কইলে শোনে না। কত বড় ঘাউড়া তে ডাক দিলাম আইলো না। নেশাখোরের মতো বইয়া রইছে দুম মাইরা, অন্ধকার রুমের মইধ্যে। মনডা কয় ঘাড়টা বেড়াইয়া একটা দিতাম।’
এই সময় প্রণব অথবা পল্লব সামনে থাকলে প্রণবের মা হয়তো তাদের কাউকে একটা চড় দিয়ে বসতেন, কিন্তু ওদের কেউই সামনে ছিল না বিধায় তিনি কিছুক্ষণ তার কাজ করে গেলেন অর্থাৎ দুর্নিবার রাগের জ্বালা, বুকের পাঁজরে সংহত রাখলেন। খানিক পরেই তার ভাষার তেজ প্রণবের কাকাকে বুঝিয়ে দিল, তার একটু আগের ধৃষ্টতা তিনি সহ্য করবেন না ‘রাখ আজকা আইয়ক তোর বাপ। তুই কেমনে এই বাড়িত থাকস, আমি দেখমু। পোলা তুই ঘরের একটা কাম করতি না, এই ঘরের ভাত খাইবি—- কেমন রোখ, ঘাড় বেড়াইয়া মারবো! তুই মাইর খাইবি না? আমার মতে একটা দুইডা খাইতি তই তুই ঠিক হইতি, মাইনসেরও আশা পূরণ হইত। নে নে তুই বইয়া থাক, ইট পাহারা দেওনের লিগা তোর ঠান্মারে পাডাইছি, বেডির মুখ যেমন হইয়া রইছে কুত্তার পুটকিডা। কত পরিশ্রমের কাজ না এইডা! এর থিকা মাইনসে লইয়া যাইত একটা দুইডা কইরা তই তোরা ঠান্ডা হইতি। পুটকি মারা না খাইলে শিক্ষা হয়নি তোরার!’
‘এই খানকি আমি তোরে কিছু কইছি নি? তোর এত লাগে কা। আর তুই ডর দেহাস কারে। তোর লাঙ’রে আমি ডরাই না। কামাই করি না দেইখ্যা কি হইছে, তোর মতো কয়েকটা মাগিরে খুন কইরা ফালাইয়া থুইলেও লিটুরে কেউ কিছু জিগাইতে আইত না। যে ভআওড়ার জোরে তুমি মানুষেরে মানুষ বুইজ্যা গইন্য কর না, হে’র শক্তি নাই আমারে ঠৈহানের।’
‘আমি তোর লগে কতা কইছি, না তোরে কিছু জিগাইছি, কাম করছ না, ধাম করছ না বেডা, বেডিহেইতের লগে যে লাগদি আইয়স সরম করে না?’
‘দেখ, তুই অতিরিক্ত বাইড়া গেছস। এমন মাইর লাগামু যে, বেডি-বেডা বিচার করতাম না।’
‘হু, এদ্দুরি পারবা, কিলাইতা।’ এইটুকু বলে প্রণবের মা চুপ করলেন এবং একটু পরেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। পাথরের আঘাতে ভেঙে যাওয়া ঢেউয়ের মতো উনার কান্নায় ছিটকাতে লাগল ক্ষোভ।
এতক্ষণে প্রণব এসে তার মা’র পাশে দাঁড়ালো। প্রণব দেখল তার মা’র চোখ দিয়ে অবিরল পানি ঝরছে এবং উনার ছন্দময় বিলাপের সাথে তাল মিলিয়ে উনার শরীর স্পন্দিত হচ্ছে। প্রণবের কাকা ইতিমধ্যে বের হয়ে গেছে। প্রণবের মা তবুও কাঁদছে, পরাজিত এবং অপমানিত রাজার হৃদয় যেভাবে কাঁদে। মা’য়ের জন্য প্রণবের খুব কষ্ট হলো।
‘তে বুজি এরকমই করব? তারে কেউ ডাক দেওয়াইন্যা নাই?’
‘কি করতাম ক, পিছামারাডা কোন কাম করে না, ঘরে থাইক্যা সবার লগে ঝগড়া করে। আমার লগে তো খানকি-নডি ছাড়া কথাই কয় না। আজকা হেবেডিরে ইচ্ছামতো গাইল্লাইয়া গেছে। আর বেডিও কেমন, তুমি জান না হেতে একটা জানোয়ার। নাইলে প্রণবরে কিছু কইছে। কাকা হিসাবে কি তারে কিছু কওনের অধিকার নাই তার। তুমি বেডি হেইডা গায়ে মাইখা লইছস। কি কি বলে কইছে। হেতে মাডে গিয়া কয় আর কান্দে। আমি তো বুঝি। তে যে বেডিরে এত কতা কইয়া আইছে, এডি আমারে কয় নাই। বাসাত আইছি পরে, প্রণবে আমারে কয়, কাকায় মা’রে গাইল্লাইছে। বেডি রান্নাবাড়ি বন্ধ কইরা ঘরে দরজা আটকাইয়া কান্দে। দুপুরে ভাত খাইতে ডাকলাম, আইয়ে না। তুই ক, আমি কই যাইতাম। ঐ অসুরটা বাইর হইছে, কইয়া গেছে আর আইত না। হেতে ফিরা না আইলে আমি বাঁচি, তোরারও শান্তি হয়। এমন বিডাইল্যা সংসার জীবনে করছি না, করতামও চাই না। ধর্মে তো নেয়ও না আমারে।’
মা’য়ের কথাগুলোর পাশে নিজের অভিযোগগুলো মানায় না বলে প্রণবের বাবার কিছু বলতে ইচ্ছা করলেন না। কিন্তু উনার মগজে অমীমাংসিত অস্বস্তিকর বিরাগ ছটফট করছিল, সে কারণে কিছুক্ষণ চুপ থেকে তিনি প্রণবকে ডাকলেন। তৃতীয় বারের ডাকে প্রণবের দুশ্চিন্তার রাজ্য ভেঙে গেল এবং প্রণব বাবার কাছে আসল। ‘কিরে, ডাক কানে যায় না।’ -প্রণব চুপ
‘অন্ধকারে বইয়া আছিলি কিল্লিগা?’
‘এমনি।’
‘এমনি? কেউ ডাক দিলে উত্তর দেস না কিল্লিগা?’
‘কারো কোন কথা শোনে না। বেয়াদপ হইতাছে একটা।’ -প্রণবের ঠাকুমা কথাগুলো গুঁজে দিলেন।
‘কারো কোন কথা শুনছ না দুইডা ভাই। দুপুরে তোর কাকা ডাকছে, গেছস না। হেই লইয়া কত বড় ঝগড়া হইছে দেখছস।’
বাবার কথাগুলো জলের উপরে শ্যাওলার মতো প্রণবের মগজের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গেল, প্রণব তখনো চুপ। ‘কালকে তোর বন্ধু পার্থ কইলো মার্কশীট নাকি কবেই দিয়া দিছে, তুই স্কুলে গিয়া হেইডা তুলছ না কিল্লিগা? কলেজে ভর্তি হওনের ইচ্ছা নাই নি? পড়ালেখা করতি না আর? কি, উত্তর দেস না কা?’ -প্রণবের সমস্ত শরীর কেঁপে উঠলো, বলল ‘কালকে যামু’
‘হ্যাঁ, তাড়াতাড়ি মার্কশীটটা তুলবি, আর ঘরের কাম দেখাশোনা করবি। তোর কাকা কবে আইয়ে ঠিক নাই। আমিও অফিসে যামু, ঘরের কাম-কহন কোনডা লাগে ঠিক নাই। তুমি কোডাত বইয়া থাকবা না। যদি শুনি এর ব্যতিক্রম হইছে, খুব খারাপ হইব, বুঝছ!’
প্রণব বুঝেছে, সেটা ও মুখে না বললেও বুঝা যায়, আর প্রণবের বাবাও এখন অন্তরে স্বস্তি বোধ করছেন।
তিন
কৃষ্ণ বর্ণের ছেলেটিকে খুব অস্থির দেখাচ্ছিল। মানুষ ডিস্টার্বড থাকলে, তার চেহারায় যেমন অমনোযোগিতার লক্ষণ পাওয়া যায় ওর মুখেও তেমনি অন্যমনস্কতা রাগে রূপান্তরিত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল। সেজন্য প্রণব তাকে কোন কড়া কথা বলতে সাহস করেনি, যদিও কঠিন কিছু বলবার হক তার ছিল।
গলির অপর মাথায় প্রণবকে দেখে, কালো ছেলেটির মুখ নিভা প্রদীপের মতো বিবর্ণ হয়ে যেতে দেখেও প্রণব কেমন এক অলসতায় কালো ছেলেটির অঙ্কুরিত ভয়কে বড় হবার উপযুক্ত পরিবেশ দিতে পারল না। প্রণবের কথায় পাওনাদারের তেজ ছিল না।
ভয় মরে যাওয়ায় ছেলেটির মুখের অস্থিরতা পুনরায় ফিরে আসলো, এমনকি প্রণবকে আয়ত্তে আনার জন্য যতটুকু শ্রম তার স্বভাবসিদ্ধ প্রক্রিয়ায় দেওয়ার কথা ছিল, তা সে দিতে পারলো না। তার সমস্যার কথা বেশী বেশী উকি দিচ্ছিল তার কথায়।
‘দেখেন ভাই আমি বড়ই ভেজালে আছি। আপনের কাগজ আপনে পাইবেন। আমি ভাবছিলাম দেখা করমু কিন্তু ভাই সমস্যা, চাইর কিনার দিয়া সমস্যা।’ এমন পরিস্থিতিতে প্রণবের বলা উচিত ছিল ‘আপনের সমস্যা আপনের কাছেই থাক। টাকা নেওনের সময় তো সমস্যার কতা শুনি নাই। এখন কাজের বেলা কি বালের সমস্যা আমনের। আমার কাগজ বাইর করেন আমনে।’ কিন্তু প্রণব এমন কিছুই বলল না, যাতে কালো ছেলেটির, কালো মুখের অবদমিত রাগটা প্রকাশ পায়। কারণ এখন যদি সে বলে ‘দিতাম না আমনের মার্কশীট, আমনে কিতা করবেন করেন দেহি।’
তাহলে? তাহলে তার কিছুই করার নেই, চুপ করে চলে আসা ছাড়া। জনি হলে হয়তো এ কথার প্রতিবাদ করতে পারতো। যা হবার হোক, ঐ ছেলের ক্ষমতার চূড়ান্ত দেখে ছাড়তো, কিন্তু প্রণব তা পারে না। তার অলস নির্বিবাদ মনকে এমন একটি পরিস্থিতির সম্মুখে দাঁড় করানোর চেয়ে অনেক সহজ নির্বিবাদে চুপিসারে মায়ের বালা চুরি করা, অনেক সহজ বালা বিক্রির টাকাটা বরবাদ হয়ে গেল দেখেও আপসোস না করে মনকে নির্লিপ্ত রাখা। তাই সে বলল ‘আচ্ছা আগের ডেইট তো মিস হইল, এবার আরেকটা ডেইট দেন, এটা যাতে মিস না হয়।’
‘না, হবে না। আপনে পাইবেন।’ স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছিল ছেলেটি মিথ্যা বলছে, কারণ ‘পাইবেন’ শব্দটার প্রতিটি সিলেবেলে দ্বিধা ও অনিশ্চয়তার সুর শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু যেহেতু বিশ্বাস না করে উপায় নেই, প্রণবকে সেকথা বিশ্বাস করতেই হলো, তবু একটা প্রশ্ন না করে পারলো না।
‘আপনেরে পাব কোথায়? আগের জায়গায় আমি কয়দিন ঘুরছি। আপনের বাসার ঠিকানাটা দেন।’
‘বাসায় গিয়া কি করবেন? আমি কাগজটা বের করলে আপনাকে দিয়ে যাব।’
প্রণব বলল ‘আচ্ছা।’
ছেলেটি এতক্ষণে নিশ্চিত হয়েছে, প্রণবকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, তাই সে উত্থাপন করতে পারল ‘আরো কিছু টাকা কিন্তু লাগে। আপনার তো টাকা বাকি ছিল? আজকে দিলে ভাল হত।’ টাকা থাকলে প্রণব দিয়ে দিত কিনা জানি না। কিন্তু প্রণবের কাছে সত্যিই তখন টাকা ছিল না। ছেলেটি চলে যাবার পর দুজনেই তাদের পরিচিত মনভূমিতে ফিরে এসেছিল।
এই সাক্ষাৎকারের পর প্রণবের দমিত দুশ্চিন্তা নতুন করে সজাগ হলো। স্টিলের আলমারি হতে মায়ের বালা চুরি করার পর, ধরা পড়ার ভয় আর অপরাধ বোধের মিলিত যন্ত্রণা এতদিন তাকে ভুলিয়ে রেখেছিল নকল মার্কশীট হাতে পাওয়ার অনিশ্চয়তা থেকে। আজ সকালের সাক্ষাতের পর সেইসব যন্ত্রণাদায়ক চিন্তাগুলো পুনরায় ফিরে আসলো অসহ্য ছেলেটির অস্বস্তিকর সান্নিধ্যের স্মৃতি সহ। প্রণব তার আশা সফল হবার বাস্তবতা কতটুকু তা খতিয়ে দেখল। সে কালো ছেলেটির আচরণ ও কথা খুটিয়ে, কোন মতেই কোন ইতিবাচক সিদ্ধান্তে আসতে পারলো না, সব যুক্তিই তার আশাকে নিষ্ফল প্রমাণ করে। তাই কালো ছেলেটির মিথ্যাচারের জন্য ওর প্রতি একপ্রকার চরম রাগে সে আক্রান্ত হলো, যা আগে সে কখনো অনুভব করেনি।
বাসায় প্রণব এখন নিজেই নিজের কাছে অপরিচিত। সেদিনের ঝগড়ার পর হতে তার মা তার সাথে কথা বলে না। তার ঠাকুমা নিজেকে নিয়ে নিজের ব্যস্ততার মাঝে সময় পেলেই প্রণবদের (বিশেষভাবে প্রণবের) দোষগুলো সবিস্তারে বর্ণনা করে। প্রণবের কাকা এখনো বাড়ীতে ফিরেনি। বাবা যদিও আগের মতোই আছে, তবু প্রণবের সবখানি ভয় তার বাবাকে নিয়েই।
এখন জনির সাথে আলাপ করাটাই জরুরী, কিন্তু জনির সাথে দেখা করতে তার ভয় হচ্ছে। বিকালের দিকে জনি নিজেই আসলো। প্রণব যে ভাবনাটা সচেতন মনের আড়ালে ভেবেছে শেষ পর্যন্ত সেটাই সত্য হবে; জনির কথায় সেই ইঙ্গিত স্পষ্টভাবে পাওয়া গেল। এজন্য জনির মনে অপরাধ বোধ আছে, তবে সে তা স্বীকার করতে চায় না প্রণবের কাছে। সে কেমন সুবিবেচকের মতো বললো ‘হেরা এমনিই করে। গতিক খারাপ দেখলেই হাওয়া হইয়া যায়। কমপক্ষে বিশ জনের টাকা লইয়া গেছে সে। রাখ কুমিল্লা শহরে তে আইত না?’
কুমিল্লা শহরে সে আসলে, তাকে হয়ত জনিরা মিলে পিটাবে, কিন্তু তাতে কি প্রণবের সমস্যার সমাধান মিলবে? জনিকে এই প্রশ্ন করা হয়তো প্রণবের উচিত ছিল, কিন্তু তা না করে বিশ জনের একজন হয়ে সে তার যন্ত্রনাকে কম করার চেষ্টা করলো।
জনি চলে যাবার পরই সন্ধ্যা হলো। অন্ধকার ঘরে বসে প্রণব তার নির্বাক মায়ের নীরব কাজকর্ম দেখতে লাগলো। পুরোটা সন্ধ্যা, সে বসে বসে মায়ের কাজ ও ঘরের যাবতীয় জিনিসপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে দেখলো। খুব ছোটবেলার এমনি একটি আত্মবিস্মৃত সন্ধ্যার কথা মনে আসলো আর প্রণবের চোখ ছলছল করে কান্না পেল, কিন্তু সে কাঁদলো না।
বাল্বের পুরানো আলোর নিচে শুয়ে শুয়ে, তার কেবল ছোটবেলার কথা মনে আসলো। নির্দিষ্ট সময়ে তার ঠাকুমা তাকে ভাত খেতে ডাকলো, সে ডাকের কোন সাড়া না দিয়ে মায়ের কোলের মতো আত্মহত্যার উষ্ণ আশ্রয়ের কথা ভাবতে লাগলো। প্রণবের বাবা আসলেন, খেলেন, তারপর ঘুমাতে গেলেন। কিছুক্ষণ পর সবাই ঘুমাতে গেলেন। প্রণব অনেক আগে থেকেই ঘুমের আশায় শুয়ে ছিল। কিন্তু ঘুম আসেনি, এখনো আসে না। সে ছেলেবেলার স্মৃতি, আত্মহত্যা ইত্যাদির থেকে আরো উষ্ণ অবলম্বন খুঁজতে লাগলো মনে মনে- আরো উষ্ণ। সে কাঁথা গায়ে দিল, চোখের জলে অনেকক্ষণ ধরে বালিশ ভিজেছে। হঠাৎ আরো উষ্ণতার আশায় প্রণব বিছানার সাথে বুক মিশিয়ে শুলো। দুই পা শক্তকরে দুই দিকে ছড়িয়ে দিল আর কল্পনায় খুব কোমল একটি মুখ মনে আনতে চেষ্টা করলো। অনেকক্ষণ সেই কোমল মুখে চুমু দিয়ে বুক দিয়ে বুক চেপে অনেক কঠিন হবার চেষ্টা করলো, কিন্তু কোমল মুখ ভালো লাগে না, সে ইচ্ছা করেই তা হারিয়ে ফেলে। সে নতুন মুখ খোঁজে- একটু কঠিন মুখ। মনে পড়ে না। একটি কালো মুখ মনে পড়ে। সেই মুখ কঠিন, রুক্ষ, নিষ্ঠুর—- তার ভালবাসার যোগ্য নয় সেটা, ঘৃণার যোগ্য। সেই ঘৃণিত মুখ তার দিকে এগিয়ে আসে কেন? ঘৃণার কাছ থেকে সে ভালবাসা নিতে চায় না। অবশ্য সে তো ভালবাসা দেয় না- কঠিনভাবে প্রণবকে মর্দন করে সেই কালো মুখ, তার কালো শরীর দিয়ে। এইভাবে মর্দিত হওয়ার মাঝে সুখ আছে। কালো ছেলের নিষ্ঠুর আলিঙ্গনে, প্রণব তার কাঙ্ক্ষিত উষ্ণতা খুঁজে পেল?
কল্পনার অত্যাচারে ক্লান্ত হয়ে প্রণব ঘুমিয়ে পড়লো। সে আর কোনদিন কালো রঙের ছেলেটিকে ভয় পায়নি।
Leave a Reply